সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ (West Bengal Elections 2026) -এর দ্বিতীয় দফা শেষ হতেই সামনে এল এমন এক পরিসংখ্যান, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখে দিল। ভোটদানের হারে অতীতের সমস্ত নজির ভেঙে দিয়ে শীর্ষে উঠে এল পশ্চিমবঙ্গ। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার শেষে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে প্রায় ৯২.৪৭ শতাংশ। প্রথম ও দ্বিতীয় দফা মিলিয়ে সেই হার দাঁড়িয়েছে ৯২.৮৫ শতাংশে, যা ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বোচ্চ। প্রথম দফার ভোটগ্রহণেই এই প্রবণতার আভাস মিলেছিল। গত ২৩ এপ্রিল ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়, যেখানে ভোট পড়েছিল ৯৩.১৯ শতাংশ। সেই সময় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) জানিয়েছিলেন, ‘স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি ভোট আগে কখনও দেখা যায়নি।’ দ্বিতীয় দফার পর সেই ধারাই আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তা জাতীয় রেকর্ডে পরিণত হয়েছে।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল ত্রিপুরার (Tripura) দখলে। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেখানে ভোট পড়েছিল ৯১.৮২ শতাংশ, যা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অক্ষত ছিল। পশ্চিমবঙ্গ সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি করল। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে বরাবরই ভোটদানের হার তুলনামূলক বেশি। যেমন নাগাল্যান্ডে (Nagaland) ১৯৯৩ সালে ৯১.৫৩ শতাংশ, মণিপুরে (Manipur) ১৯৯৫ সালে ৯১.৪১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। তবুও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক এই হার সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের এই হার অনেকটাই এগিয়ে। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে ভোটের হার তুলনামূলক কম থাকে। উত্তরপ্রদেশে (Uttar Pradesh) ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ ৬১.০৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা এখনও পর্যন্ত দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন রেকর্ড। দিল্লি (Delhi), উত্তরাখণ্ড (Uttarakhand), বিহার (Bihar), ঝাড়খণ্ড (Jharkhand) প্রতিটি রাজ্যের ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ ভোটদানের হার পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিসংখ্যানের থেকে অনেকটাই কম। পশ্চিম ভারতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। রাজস্থান (Rajasthan), গুজরাত (Gujarat), মহারাষ্ট্র (Maharashtra) বা গোয়া (Goa) কোনও রাজ্যই ৮৫ শতাংশের বেশি ভোটদানের হার নিয়মিত ছুঁতে পারেনি। দক্ষিণ ভারতেও কেরল (Kerala) ও অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh)-এর মতো রাজ্যে তুলনামূলক বেশি ভোট পড়লেও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো নয়।
এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক মহলে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ এত বেশি ভোটদানের হার সাধারণত নির্বাচনের ফলাফলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যখন নতুন ভোটার বা এতদিন ভোট না দেওয়া মানুষদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, তখন প্রচলিত ভোটের অঙ্ক অনেক সময় বদলে যেতে পারে। ভোটগ্রহণের দিনগুলিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গিয়েছে দীর্ঘ লাইন। সকাল থেকেই বুথের সামনে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী, প্রবীণ, প্রথমবার ভোটদাতা, সব শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বহু জায়গায় এমন মানুষকেও ভোট দিতে দেখা গিয়েছে, যারা আগে খুব একটা বুথমুখী হতেন না। ফলে এই ভোটদানের হার একটি বৃহত্তর সামাজিক অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবেও ধরা হচ্ছে। এদিকে, এসআইআর (SIR)-এর পর দেশের অন্যান্য রাজ্যেও ভোট হয়েছে এবং সেখানে কিছু ক্ষেত্রে ভোটদানের হার বেড়েছে। যেমন অসমে (Assam) ২০২৬ সালে ৮৫.৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ওই রাজ্যের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড। তামিলনাড়ুতেও (Tamil Nadu) এবার ভোটের হার বেড়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো করে সর্বভারতীয় রেকর্ড গড়ার ঘটনা অন্য কোথাও ঘটেনি।
জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu and Kashmir)-এর মতো অঞ্চলে ভোটদানের হার ঐতিহাসিকভাবে কম হলেও ১৯৮৭ সালে সেখানে ৭৪.৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এই তুলনামূলক চিত্র আরও পরিষ্কার করে দেয়, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভোটের হার কতটা ব্যতিক্রমী। নির্বাচনী প্রক্রিয়া মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ছিল বলেই জানা গিয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল এবং প্রশাসনিক নজরদারি ছিল কড়া। ফলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এখন দেখার, এই বিপুল ভোটদানের হার শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, যখন ভোটারদের অংশগ্রহণ এতটা বেড়ে যায়, তখন ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর নির্বাচন সেই দিক থেকে এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 Analysis | ভোট যুদ্ধ ২০২৬ : বাংলার মাটিতে ক্ষমতার মহারণ, কার দখলে যাবে নবান্ন?



