২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন
তৃণমূল স্তরে সংগঠন ছাড়া যেখানে ৮০ হাজারের ওপর পশ্চিমবঙ্গে ভোটকেন্দ্র সেখানে সমস্ত ভোট কেন্দ্রে পার্টির এজেন্ট বসানো সম্ভব নয়। তারপরও রাজ্য নেতৃত্ব ভেবেছিলেন হয়তো সাধারণ মানুষের ক্ষমতা পরিবর্তনের চিন্তাধারাকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বোঝাতে থাকেন যে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট পরিচালনা করলে এবারে লোকসভা ভোটে ভারতীয় জনতা পার্টি নিশ্চিত ভাবে কমবেশি ৩০ টি আসন দখল করতে সক্ষম। লিখেছেন : অগ্নিপ্রতাপ

৪.
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২১৫ টি কেন্দ্রে শাসক জয় ছিনিয়ে নেবার পর পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি সংক্রান্ত পূর্বের মামলা এবং ২০২১ সাল থেকে যেসব মামলাগুলি নতুন করে হতে থাকে তাতে শাসককে ভীষণ অস্বস্তি অবস্থায় ফেলে দেয়। একে একে আমলা, হেভি ওয়েট ক্যাবিনেট মন্ত্রী, বিধায়ক, উচ্চ নেতৃত্ব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন দুর্নীতি মামলায় অ্যারেস্ট হয়ে যান। তদন্ত চলাকালীন উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। দিন দিন বিরোধীরা সুর চড়াতে থাকেন, শুধু কান ধরলে হবে না এবার মাথাকেও ধরতে হবে। আর শাসকের দাবি ছিল যে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র করে তাদের নেতৃত্ব এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গকে কেন্দ্রীয় এজেন্সি দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। আবার বিরোধীদের দাবি ছিল যা কিছু তদন্ত হচ্ছে তার সম্পূর্ণ কোর্টের মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অতএব এখানে কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি নিজের ইচ্ছামতো কখনওই তদন্ত করতে পারে না।
পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক দল যা বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টি আদর্শগত ভিত্তি পূর্বে যা ‘ভারতীয় জনসংঘ’ (১৯৫১) প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা ছিলেন মহান বাঙালি ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কোনও অজ্ঞাত কারণে নির্বাচন ক্ষেত্রে প্রার্থী পরিবর্তন রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সহমত আজকের দিনে সকলেরই জানতে ইচ্ছা করে। পরবর্তীকালে অনেকেই বলেছেন এই ধরনের সিদ্ধান্ত একটা আত্মহত্যার শামিল। যেখানে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস তৃণমূল স্তরে যে শক্তিশালী সংগঠনের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নির্বাচন কমিশনার যতই আইন মোতাবেক যা কিছু পদক্ষেপ অবলম্বন করুক না কেন সুদৃঢ় ও সুচিন্তিত ভাবনা সঙ্গে নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বলিষ্ঠ সংগঠন ছাড়া কোনও অবস্থাতেই বা কোনও পরিস্থিতিতেই জয় হাসিল করা যথেষ্টই কঠিন।
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 | ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ৩
এরই মধ্যে লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় ২০২৪ সাল। অনেকেই ভেবেছিল এবার হয়ত ভারতীয় জনতা পার্টি ২০১৯ সালের লোকসভা থেকে নিশ্চয়ই আরও ভাল রেজাল্ট করবে। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটে সব থেকে চর্চিত বিষয় যেটি ছিল সেটি হল ২৬,০০০ চাকরি বাতিল মামলায় মহামান্য উচ্চ আদালতের তৎকালীন বিচারক মাননীয় অভিজিৎ গাঙ্গুলী এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সন্দেশখালি। বিচারক অভিজিৎ গাঙ্গুলী এজলাসে সেই ২৬ হাজার চাকরি বাতিল রায় দেন। পরবর্তীকালে তিনি কর্মজীবন থেকে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন ও পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক লোকসভা আসন থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তার নিকটতম প্রার্থী তৃণমূল কংগ্রেসের দেবাংশু ভট্টাচার্যকে পরাজিত করেন। বিচারক থাকাকালীন অভিজিৎ গাঙ্গুলী এজলাসে যে সকল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তার জন্য তাকে বেশিরভাগ মানুষ এবং চাকরিপ্রার্থী থেকে বিচার প্রার্থীরা ন্যায় দেবতা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এরফলে বিভিন্নভাবে তাঁকে শাসকের রোষানলে পড়তে হয়েছে বারংবার। যখন তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন শাসকের অভিযোগ ছিল বিচারক হিসেবে উনি কোনওদিন নিরপেক্ষ বা ন্যায় বিচার করতে পারেননি। কারণ তিনি একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে পরিচালিত ছিলেন যা পরবর্তীকালে ইস্তফা দেবার পর শাসক ঘনিষ্ঠ আইন অজ্ঞদের বিক্ষোভ এবং কটুক্তির সামনে পড়তে হয়।
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 | ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ২
আর সন্দেশখালি হল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার অন্তর্গত সুন্দরবনের কাছাকাছি জায়গা যেখানে জলদস্যুতে আক্রমণ, নারীদের ওপর অত্যাচার ও পাচারের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন জিনিস লুটপাটের একটি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা বলে উল্লেখ। সন্দেশখালি আন্দোলন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গই নয় সারা ভারতে এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়। ২০২৪ সালে ৫ জানুয়ারি রেশন দুর্নীতিকাণ্ডে খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে সাথে সন্দেশখালির শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের বেতাজ বাদশা শেখ শাহজানের যোগ সূত্র থাকার কারণে, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরের প্রতিনিধিদল জিজ্ঞাসাাবাদ করতে গেলে ওই দলের ওপর হামলা চালানো হয়। জমিকে কেন্দ্র করে বহু আন্দোলন দেখা দেয় আর সেটা নির্বাচনের একটা বিরাট অংশ প্রভাব পড়ে। অভিযোগ ওঠে, তৃণমূল কংগ্রেসের বেতাজ বাদশা শেখ শাহজাহানের দলবল চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে দখল করে মাছ চাষের জন্য। অভিযোগ ওঠে, সন্দেশখালি কেন্দ্র করে সেখানে নারীদের উপরে পাশাপাশি চলতে থাকে নির্যাতন। শাসকের দলবলে পিঠে খাবার ইচ্ছা হলে নারীদের ডাক পড়ত পিঠে বানাবার জন্য। শেখ শাহজাহান আইনের জালে পড়তেই সন্দেশখালির নারীরা ঝাঁটা লাঠি হাতে বিদ্রোহ করে শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। আর সেখান থেকেই প্রতিবাদী নারী হিসেবে উঠে আসে রেখা পাত্র। তিনি পরবর্তীকালে এই কেন্দ্র থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির তরফ থেকে নির্বাচন লড়াই করেন এবং নির্বাচনে পরাজিয় হন। এই নির্বাচন যে প্রহসনে পরিণত হয়েছে এবং শাসক নিজের ইচ্ছামত ভোট দানে বাধা এবং অবাধ ছাপ্পা করেছে বলে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হোন এবং পরবর্তীকালে তিনি আইনের আশ্রয় নেন। সেইখান থেকে সারা দেশের নজরে আসে এই সন্দেশখালি। এবারের লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী অর্থাৎ বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টি উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। কারণ একদিকে শাসকের বহু নেতা, মন্ত্রী, পদাধিকারী, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তদন্ত চলাকালীন জেলবন্দী। অতএব সেই দিক থেকে দেখতে গেলে পরে ২০২৪ এই লোকসভা ভোট ভারতীয় জনতা পার্টি পাখির চোখ করে ছিল অন্তত ৩০টা লোকসভা আসন তারা জিততে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় এজেন্সি দ্বারা একের পর এক পদক্ষেপের ফলে শাসক কে বারংবার বিরাট বিরম্বনায় পড়তে হচ্ছিল। ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নেতৃত্ব মনে করেছিলেন যেখানে সমস্ত কিছুতে দুর্নীতি, স্বজন পোষণ, কাটমানি, অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে হয়ত এবারের তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু রাজ্য নেতৃত্ব এটা কখনওই তারা বুঝতে পারেননি তৃণমূল স্তরে সংগঠন ছাড়া যেখানে ৮০ হাজারের ওপর পশ্চিমবঙ্গে ভোটকেন্দ্র সেখানে সমস্ত ভোট কেন্দ্রে পার্টির এজেন্ট বসানো সম্ভব নয়। তারপরও রাজ্য নেতৃত্ব ভেবেছিলেন হয়তো সাধারণ মানুষের ক্ষমতা পরিবর্তনের চিন্তাধারাকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বোঝাতে থাকেন যে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট পরিচালনা করলে এবারে লোকসভা ভোটে ভারতীয় জনতা পার্টি নিশ্চিত ভাবে কমবেশি ৩০ টি আসন দখল করতে সক্ষম। সেইমতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে উচ্চ নেতৃত্বের দ্বারা বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করা এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনার ও রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের কাছে বারংবার বারংবার কেন্দ্রীয় বাহিনী দ্বারা ভোট পরিচালন দাবী জানাতে থাকেন। ঠিক যেমনটি ভারতীয় জনতা পার্টি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য একমাত্র বিরোধীদল চেয়েছিল ঠিক তেমনি ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী অফিসার বিরোধী দলের দাবিতে সিলমোহর দেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে অনেকগুলি নির্বাচনক্ষেত্র প্রার্থী পরিবর্তন করে অন্যত্র নির্বাচন কেন্দ্রে লড়াই করার বঙ্গ রাজ্য ভারতীয় জনতা পার্টির গৃহীত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সহমত পোষণ করেন। ফলাফল ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন বঙ্গ রাজ্য ভারতীয় জনতা পার্টি প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, প্রাক্তন বিধায়ক এবং সংসদ দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে প্রথম সারির হেভিওয়েট নেতৃত্বের পরাজয় ঘটে। ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সভাপতি ছিলেন ডঃ সুকান্ত মজুমদার। বালুরঘাট লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ২ বার জয় লাভ করেন এবং বর্তমানে তিনি ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রক ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রক এর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক দল যা বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টি আদর্শগত ভিত্তি পূর্বে যা ‘ভারতীয় জনসংঘ’ (১৯৫১) প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা ছিলেন মহান বাঙালি ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কোনও অজ্ঞাত কারণে নির্বাচন ক্ষেত্রে প্রার্থী পরিবর্তন রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সহমত আজকের দিনে সকলেরই জানতে ইচ্ছা করে। পরবর্তীকালে অনেকেই বলেছেন এই ধরনের সিদ্ধান্ত একটা আত্মহত্যার শামিল। যেখানে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস তৃণমূল স্তরে যে শক্তিশালী সংগঠনের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নির্বাচন কমিশনার যতই আইন মোতাবেক যা কিছু পদক্ষেপ অবলম্বন করুক না কেন সুদৃঢ় ও সুচিন্তিত ভাবনা সঙ্গে নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বলিষ্ঠ সংগঠন ছাড়া কোনও অবস্থাতেই বা কোনও পরিস্থিতিতেই জয় হাসিল করা যথেষ্টই কঠিন। অবশেষে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন সবাইকে অবাক করে শেষ হাসিটা শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী পক্ষ থেকে কেড়ে নেয়। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি ৪২ টি লোকসভা আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯ টি লোকসভা আসন এবং ভারতীয় জনতা পার্টি ১২ টি লোকসভা আসন দখল করেন। ভোটের ফল প্রকাশের পরে ভারতীয় জনতা পার্টি লোকসভা নির্বাচন চলাকালীন বিভিন্ন জায়গায় হিংসা, ভীতি প্রদর্শন, ভোটদানে বাধা, গণনায় গন্ডগোল এবং বিভিন্ন জায়গায় বিরোধীদের উপর আক্রমণ, কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কাজ না করিয়ে বসিয়ে রাখা সেসব নিয়ে সোচ্চার হোন। (চলবে)
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 | পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ১




