সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পূর্ব বর্ধমান : পূর্ব বর্ধমান (Purba Bardhaman)-এর গলসি (Galsi) এলাকার একটি গ্রাম হঠাৎই রাজ্য রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীকে গ্রামে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না, এমন বার্তা দেওয়া পোস্টার ঘিরে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা। সিংপুর (Singpur) গ্রামে সাঁটা এই পোস্টার এখন প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের নজরে। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো ওই পোস্টারে সতর্কীকরণের ভাষায় লেখা হয়েছে, ‘ভোটার তালিকায় নাম ও তথ্য সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীকে গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’ এই বার্তার মাধ্যমে গ্রামবাসীদের ক্ষোভ এবং উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, এটি সঠিক ভোটার তালিকা এবং নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে এক ধরনের প্রতিবাদ। ঘটনার পেছনে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক। স্থানীয় সূত্রে খবর, গলসি ১ নম্বর ব্লকের উচ্চগ্রাম গ্রামপঞ্চায়েত (Uchhagram Gram Panchayat)-এর অধীন এই গ্রামে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫০১। এর মধ্যে ১০২ জনের নাম যাচাইয়ের আওতায় ছিল। শুনানির পর প্রায় ৪২ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। এই সংখ্যা গ্রামবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও এই পোস্টার কে বা কারা লাগিয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাইছেন না। কিন্তু আড়ালে অসন্তোষ যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দা কাজি বদরে আলম (Kazi Badre Alam) বলেন, ‘গ্রামেরই কেউ হয়তো এই পোস্টার লাগিয়েছে।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাঁদের রোহিঙ্গা বলা হচ্ছে, এই বিষয়টা খুব উদ্বেগের।’
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই শুধুমাত্র ভোটাধিকার হারানো নয়, নাগরিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়, এমনটাই মনে করছেন অনেকেই। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তরজা। জেলা তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর সাধারণ সম্পাদক দেবু টুডু (Debu Tudu) এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং অভিষেক ব্যানার্জী (Abhishek Banerjee) বারবার এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে, যার ফলে বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে।’ তাঁর মতে, গ্রামবাসীদের ক্ষোভ সেই কারণেই প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই অভিযোগ মানতে নারাজ। গলসির বিজেপি (Bharatiya Janata Party) প্রার্থী রাজু পাত্র (Raju Patra) বলেন, ‘এটি পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের বিষয়। এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলছে। অন্য কোথাও এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি।’ তাঁর বক্তব্য, এই বিষয়টি অযথা রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পোস্টার লাগানোর মতো ঘটনা কী ভাবে ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে বলে সূত্রের খবর। গ্রামের পরিবেশ বর্তমানে কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ হলেও প্রকাশ্যে কোনও সংঘর্ষ বা অশান্তির খবর নেই। তবে পোস্টারের ভাষা এবং বিষয়বস্তু ইঙ্গিত দিচ্ছে, সমস্যা গভীরে রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা এই ঘটনার মাধ্যমে সামনে এসেছে। বিশেষ করে, ‘নেতা ঢুকতে পারবে না’ এই বার্তা রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামবাসীরা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য এমন পথ বেছে নিয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও কেউই প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করেননি। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া কত দ্রুত এবং কী ভাবে সম্পন্ন হয়। কারণ, নাম বাদ পড়া মানুষদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
গলসির সিংপুর গ্রামের এই ঘটনা আপাতত একটি স্থানীয় সমস্যা হলেও এর প্রভাব বৃহত্তর রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ভোটের আগে এই ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত সমাধান করা। এখন দেখার, এই পোস্টার ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কতদূর গড়ায় এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গ্রামবাসীদের দাবি পূরণ না হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই নজরে রাখছে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election, Manoj Kumar Agarwal CEO | নন্দীগ্রাম বিতর্কের রেশ কাটেনি, তবু বীরভূম-মুর্শিদাবাদ সফরে সিইও মনোজকুমার আগারওয়াল, প্রথম দফার ভোটের আগে জেলায় জেলায় তৎপরতা




