সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ চেন্নাই : ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি গভীর আবেগের মুহূর্ত তৈরি হল। দেশের প্রথম টেস্টজয়ী শেষ জীবিত সদস্য সিডি গোপীনাথ (CD Gopinath) আর নেই। বৃহস্পতিবার চেন্নাইয়ের (Chennai) আদিয়ার (Adyar) এলাকায় কন্যার বাড়িতে ঘুমের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেটের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। তাঁর প্রয়াণে ক্রিকেট মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কারণ, ১৯৫২ সালে ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম টেস্টজয়ের সাক্ষী হিসেবে যাঁরা মাঠে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন শেষ প্রতিনিধি। ২০২৪ সালে দত্তা গায়কোয়াড় (Datta Gaekwad) -এর মৃত্যুর পর গোপীনাথই ছিলেন সেই স্মৃতিবাহী দলের একমাত্র জীবিত সদস্য। তাঁর প্রয়াণ যেন অতীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়কে ইতিহাসের পাতায় সম্পূর্ণভাবে তুলে দিল।

চেন্নাই তখন মাদ্রাজ (Madras) নামে পরিচিত ছিল, সেখানেই জন্ম গোপীনাথের। অল্প বয়স থেকেই ক্রিকেটে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৫১-৫২ মরসুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর। মুম্বইয়ের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়াম (Brabourne Stadium) -এ অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচেই নিজের উপস্থিতি জানান দেন তিনি। দুই ইনিংসে অপরাজিত ৫০ ও ৪২ রান করে নজর কেড়েছিলেন ডানহাতি এই ব্যাটার। তবে তাঁর ক্রিকেট জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত আসে সেই সিরিজ়ের শেষ টেস্টে। চেন্নাইয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচেই ভারত প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়। ওই ম্যাচে গোপীনাথ ৩৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। শুধু ব্যাট হাতে নয়, ফিল্ডিংয়েও তাঁর অবদান ছিল। বিনু মাঁকড় (Vinoo Mankad) -এর বলে ইংল্যান্ডের রয় টাটেরসাল (Roy Tattersall) -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ নেন তিনি। সেই ম্যাচের জয় ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, আর গোপীনাথ হয়ে ওঠেন সেই ইতিহাসের অংশ।
ভারতের জার্সিতে মোট আটটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন গোপীনাথ। যদিও আন্তর্জাতিক কেরিয়ার দীর্ঘ হয়নি, তবুও তাঁর পারফরম্যান্স স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। টেস্টে তিনি মোট ২৪২ রান সংগ্রহ করেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল স্থিরতা এবং দলের প্রয়োজনে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর সাফল্য আরও উল্লেখযোগ্য। ৮৩টি ম্যাচে ৪২৫৯ রান করেন তিনি। রয়েছে ৯টি শতরান এবং ২৩টি অর্ধশতরান। রঞ্জি ট্রফিতে (Ranji Trophy) তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে তিনি ২৩৪৯ রান করেন। ১৯৫৮-৫৯ মরসুমে মাইসুরুর (Mysore) বিরুদ্ধে তাঁর করা ২৩৪ রানের ইনিংস আজও স্মরণীয়। শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন গোপীনাথ। ১৯৫৫-৫৬ থেকে ১৯৬২-৬৩ পর্যন্ত তৎকালীন মাদ্রাজ দলের অধিনায়কত্ব করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে দল একাধিক সাফল্য অর্জন করে এবং নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। খেলোয়াড় জীবন শেষ হওয়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন গোপীনাথ। সত্তরের দশকে জাতীয় নির্বাচক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেই কমিটির চেয়ারম্যানও হন। তাঁর নির্বাচনী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ক্রিকেট বোঝার ক্ষমতা তাঁকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সম্মান এনে দেয়। ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব সামলান।
গোপীনাথের প্রয়াণে ভারতীয় ক্রিকেট একজন প্রবীণ অভিভাবককে হারাল। তাঁর জীবন ছিল একাধারে সংগ্রাম, সাফল্য এবং ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করার গল্প। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়ত তাঁকে মাঠে খেলতে দেখেননি, কিন্তু তাঁর অবদান ভারতীয় ক্রিকেটের ভিত গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট যে ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করছিল, সেই সময়ের অন্যতম মুখ ছিলেন গোপীনাথ। তাঁর মতো ক্রিকেটারদের হাত ধরেই ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। বর্তমানে যখন ভারতীয় ক্রিকেট বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী অবস্থানে, তখন এই ধরনের পথপ্রদর্শকদের স্মরণ করা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। সিডি গোপীনাথের জীবন সেই ইতিহাসেরই অংশ, যা নতুন প্রজন্মকে বারবার ফিরে তাকাতে বাধ্য করবে। তাঁর প্রয়াণে ক্রিকেট মহল শোকস্তব্ধ। একের পর এক প্রাক্তন ক্রিকেটার, প্রশাসক এবং ক্রীড়াপ্রেমীরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এই প্রবীণ ক্রিকেটারকে। ইতিহাসে তাঁর নাম অমলিন হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Radhika Merchant watch IPL 2026 | আইপিএল ২০২৬-এ রাধিকা মার্চেন্টের হাতে ২১ কোটির ঘড়ি! বিলাসিতার নতুন সংজ্ঞা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে




