সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : গণতন্ত্রের উৎসবে আজ মুখর ছিল দেশের তিন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অসম, কেরলম এবং পুদুচেরি (Puducherry)। সকাল সাতটা থেকে শুরু হওয়া বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোটগ্রহণ ঘিরে সকাল থেকেই বুথে বুথে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়। দিন যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ভোটদানের হার। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, তিন অঞ্চলের মধ্যে পুদুচেরিতেই সর্বাধিক ভোট পড়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অসমে ভোট পড়েছে ৮৪.৪২ শতাংশ, কেরলমে ৭৫.০১ শতাংশ এবং পুদুচেরিতে ৮৬.৯২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা জোরালো ছিল। সকাল থেকেই ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। অনেকেই বলছেন, ‘সকালের প্রথম আলো ফুটতেই ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি, কারণ ভোট দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।’
এই নির্বাচনে মোট ২৯৬টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে কেরলমে ১৪০টি, অসমে ১২৬টি এবং পুদুচেরিতে ৩০টি আসন রয়েছে। পাশাপাশি কর্নাটক (Karnataka), নাগাল্যান্ড (Nagaland) এবং ত্রিপুরা (Tripura) -এর একটি করে বিধানসভা আসনেও উপনির্বাচন চলছে, ফলে গোটা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে আজকের দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অসমে এবার ভোটের লড়াই বেশ ত্রিমুখী চেহারা নিয়েছে। বিজেপি (BJP) ও কংগ্রেস (Congress) -এর পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করতে নেমেছে। রাজ্যের ২২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে তারা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নতুন সমীকরণ ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।।অন্যদিকে কেরলমে লড়াই মূলত সিপিআই(এম) (CPI-M) -এর নেতৃত্বাধীন এলডিএফ (LDF) এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF)-এর মধ্যে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA)-ও ময়দানে রয়েছে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে এই রাজ্যে তাদের প্রভাব সীমিত। কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর (Shashi Tharoor) বলেন, ‘কেরলমে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এলডিএফ ও ইউডিএফ-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।’
ভোটের দিন সকালেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma) গুয়াহাটির মা কামাখ্যা মন্দিরে পুজো দিয়ে দিন শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আজ ভোটের দিন, মা কামাখ্যার আশীর্বাদ নিয়ে রাজ্যের উন্নতির কামনা করছি।’ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কেরলমের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন (Pinarayi Vijayan) সকাল সকাল নিজের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পুদুচেরিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভি. নারায়ণস্বামী (V. Narayanasamy)-ও ভোট দেন একটি সরকারি স্কুলে। একইভাবে পুদুচেরির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এন. রঙ্গস্বামী (N. Rangasamy) ভোট দেওয়ার পর বলেন, ‘সংখ্যা নয়, সরকার গঠন করাই আমার লক্ষ্য।’ ভোট শুরুর পর থেকেই কেন্দ্রীয় স্তর থেকেও সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অসম, কেরলম ও পুদুচেরির মানুষকে অনুরোধ করছি, বড় সংখ্যায় ভোট দিন এবং বিশেষ করে যুব ও মহিলা ভোটাররা এগিয়ে আসুন।’ তাঁর এই আহ্বান ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভোটদানের হার ধাপে ধাপে কীভাবে বেড়েছে, তা নজর কেড়েছে। সকাল ৯টা পর্যন্ত অসমে ভোট পড়েছিল ১৭.৮৭ শতাংশ, কেরলমে ১৬.২৩ শতাংশ এবং পুদুচেরিতে ১৭.৪১ শতাংশ। বেলা ১১টা নাগাদ তা বেড়ে হয় যথাক্রমে ৩৮.৯২ শতাংশ, ৩৩.২৮ শতাংশ এবং ৩৭.০৬ শতাংশ। দুপুর ১টা পর্যন্ত অসমে ৫৯.৬৩ শতাংশ, কেরলমে ৪৯.৭০ শতাংশ এবং পুদুচেরিতে ৫৬.৮৩ শতাংশ ভোট পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিকেল পাঁচটার পরিসংখ্যানেই বোঝা যায়, ভোটের গতি কতটা দ্রুত ছিল। অসমে রাইজর দল (Raijor Dal)-এর প্রার্থী অখিল গোগোই (Akhil Gogoi) ভোট দেওয়ার পর বলেন, ‘আমরা ৫০ হাজার ভোটে জিতব।’ এই ধরনের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য ভোটের লড়াইকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ভোটারদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল কড়া। বিভিন্ন স্পর্শকাতর বুথে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কোথাও বড় ধরনের অশান্তির খবর পাওয়া যায়নি, যা প্রশাসনের জন্য স্বস্তির বিষয়। এই নির্বাচনে একাধিক হাই-প্রোফাইল প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পিনারাই বিজয়ন (Pinarayi Vijayan), হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma), গৌরব গগৈ (Gaurav Gogoi) এবং এন. রঙ্গস্বামী (N. Rangasamy)। ফলে ফলাফল ঘোষণার দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ধরা পড়ছে, এই নির্বাচন শুধু তিনটি অঞ্চলের ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে। ভোটারদের উত্সাহ, উচ্চ ভোটদানের হার এবং বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এসব মিলিয়ে নির্বাচন ২০২৬ ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, ফলাফল ঘোষণার দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। তবে আপাতত নজর একটাই, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটের পরিসংখ্যান, যেখানে পুদুচেরি অন্যদের ছাপিয়ে গেছে এবং গণতন্ত্রের উৎসবে অংশগ্রহণের দিক থেকে নতুন নজির গড়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics2026: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস? (আজ তৃতীয় কিস্তি)




