সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হুগলি: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ (WB Assembly Elections 2026) ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। তারই মাঝে হুগলির আরামবাগ এবং বলাগড়ে নির্বাচনী জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঘিরে তীব্র আক্রমণ শানালেন। ভোটাধিকার, নাগরিক তালিকা এবং পরিচয় রাজনীতি, এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, ‘মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, ট্রাইবুনালের দরকার কী? কেন তৈরি করেছিলেন?’ বুধবার হুগলির আরামবাগে প্রথম জনসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে তিনি বলাগড়ে পৌঁছে দ্বিতীয় সভায় বক্তব্য রাখেন। দুই সভাতেই তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিজেপি (BJP) -এর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার বার্তা। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল যা বলে, তা-ই করে’, এবং এর মাধ্যমে নিজের সরকারের প্রতিশ্রুতি পালনের রেকর্ড তুলে ধরেন।
নির্বাচনী মঞ্চ থেকে মমতার বক্তব্যে ছিল তীব্র রাজনৈতিক কটাক্ষও। তিনি বলেন, ‘শুনলেও হাসি পায়, এই বাংলাবিরোধীরা বাংলায় ভোট চায়।’ তাঁর অভিযোগ, যারা বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসের বিরোধিতা করে, তারাই আবার বাংলার মানুষের সমর্থন চাইছে। খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওদের রাজ্যে মাছ, মাংস, ডিম বন্ধ। বাঙালি মাছে-ভাতে থাকে। বলছে মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া যাবে না। তবে কি আমার মাথা খাবে?’ এই মন্তব্যে সভামঞ্চে উপস্থিত জনতার মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানে বাংলার সংস্কৃতির ওপর আঘাত। তাঁর কথায়, ‘বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানে মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া বন্ধ। বাংলা ভাষায় কথা বলা বন্ধ।’ এই মন্তব্যে তিনি সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। বলাগড়ের সভায় তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে কেন্দ্রীয় নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘ওদের পরিকল্পনা মানুষকে নিয়ে চৈত্রসেল। দেশটাকে চৈত্রসেল করছে।’ তাঁর এই মন্তব্যে তিনি অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও তুলে ধরেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল ভোটাধিকার ও ট্রাইবুনাল নিয়ে তাঁর প্রশ্ন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে ট্রাইবুনালের দরকার কী? কেন ট্রাইবুনাল তৈরি করেছিলেন। তার পরে বলছেন ফ্রোজেন করে দিলাম। আবার আমরা চ্যালেঞ্জ করব।’ তিনি জানান, সাধারণ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠছে, তা নিয়ে তাঁর দল আইনি পথে লড়াই চালাবে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা জানতে চাইব। জানার অধিকার আছে। মানুষের নাম তোলার অধিকার আছে।’ এই প্রসঙ্গে তিনি এনআরসি (NRC) -এর আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন। মমতা বলেন, ‘যদি নিজের অধিকার, অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়, ভাষা, সম্মান রক্ষা করতে হয়, ঠিকানা রাখতে হয়, তা হলে মনে রাখবেন এই নাম বাদ দেওয়ার খেলায় এনআরসি করার ছক্কা চলছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই ছক্কাকে অক্কা করে দেব।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, ভোটের আগে নাগরিকত্ব এবং পরিচয়ের প্রশ্নকে তিনি বড় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, হুগলির এই জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন, তা শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রচার নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ভোটার তালিকা, ট্রাইবুনাল এবং এনআরসি, এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে বেঁধে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করতে চাইছেন। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর পক্ষ থেকে আগেই দাবি করা হয়েছে, তাদের সরকার মানুষের পাশে থেকে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। সেই দাবিকেই আরও জোরালো করে তুলে ধরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে মানুষের অধিকার রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখার কথা।
অন্যদিকে, বিজেপির তরফে এখনও এই বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভোটের আগে এই ধরনের মন্তব্য ভোটারদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক ভাষণ এবং পাল্টা ভাষণের তীব্রতা বাড়ছে। হুগলির এই সভা সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছেন অনেকে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয়, সেগুলি আগামী দিনে নির্বাচনের মূল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BJP Foundation Day, Narendra Modi speech | বিজেপির প্রতিষ্ঠা দিবসে মোদীর বার্তা, কর্মীদের ভূয়সী প্রশংসা




