সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে ভোটের আগেই চড়তে শুরু করেছে উত্তাপ। আর সেই আবহেই বড় দাবি ছুড়ে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বিজেপি (BJP) -এর এই শীর্ষ নেতা জানিয়ে দিলেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের দল ১৭৭-এর কম আসনে থামবে না। পূর্ব মেদিনীপুরের জনসভা থেকে তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রামনগরের বালিসাই স্কুল ময়দানে আয়োজিত কর্মিসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘২০১৬ সালে ৩টি আসন, ২০২১ সালে ৭৭, এবার ১৭৭-এর নিচে নামব না।’ তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বিজেপি এবার বড় লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছে। তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাষণ নয়, নিজের বক্তব্যের পক্ষে তিনি তুলে ধরেন একটি হিসাবও, যা ঘিরে ইতিমধ্যেই তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, শুভেন্দুর এই সভা ছিল বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর মণ্ডলের সমর্থনে। সকাল থেকেই কাঁথি, তমলুক ও মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার কর্মীরা সেখানে জড়ো হন। কর্মিসভার মঞ্চ থেকেই শুভেন্দু ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘মার্জিন কত বাড়াবেন, সেটা আপনারাই ঠিক করবেন।’ তাঁর কথায়, ভোটের ফল নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্তের উপরই।
তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে করা অঙ্ক। তিনি ‘ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার’ তত্ত্বের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রক্রিয়া বিজেপির পক্ষে ফলপ্রসূ হতে পারে। তাঁর দাবি, ‘প্রথমে ব্রেকফাস্টে ৫৮ লক্ষ, তারপর লাঞ্চে ৭ লক্ষ গিয়েছে। সন্ধ্যায় চা-চিনাবাদামে ৩২ লক্ষের মধ্যে ১৪ লক্ষ বাদ গিয়েছে।’ এরপর নিজেই হিসাব কষে বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রায় ৭৯ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ছে, যা রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর দাবি, ‘এর ৯০ শতাংশ ভোট তৃণমূল পেত।’ যদিও এই দাবির বিরোধিতা করেছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উল্লেখ্য, ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যে উত্তেজনা রয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ তুলছে, এই প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন (নির্বাচন কমিশন) জানিয়েছে, নিয়ম মেনেই তালিকা সংশোধন চলছে।
শুভেন্দুর এই ১৭৭+ দাবি নতুন নয়, তবে এবার তিনি তা সংখ্যার নিরিখে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই ধরনের বক্তব্য কর্মীদের মনোবল বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আবার অন্য অংশের মতে, বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে ভোটের দিন মানুষের সিদ্ধান্তের উপরই। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-ও বাংলায় এসে বড় লক্ষ্য স্থির করে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ২০২১ সালে প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপি এবার সেই হার ৪৬-৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়। তাঁর মতে, ‘এই ৮-১০ শতাংশ ভোট বাড়লেই ২০০ আসন পার করা সম্ভব।’ একুশের নির্বাচনে ‘২০০ পার’ স্লোগান দিয়েও বিজেপি ৭৭-এ থেমে গিয়েছিল। তাই এবারের এই নতুন লক্ষ্য ও হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে বিজেপি শিবিরে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই বলেই মনে হচ্ছে। শুভেন্দুর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাজনৈতিক বার্তা। তিনি বলেন, ‘সমাজদার কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়।’ অর্থাৎ সরাসরি না বললেও তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত বোঝার জন্য যথেষ্ট বলেই তিনি মনে করেন।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে ভোটার তালিকা সংশোধন, অন্যদিকে আসন পূর্বাভাস, সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগেই তাপমাত্রা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে মরিয়া। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভোটের দিন তাঁদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, শুভেন্দুর ১৭৭+ দাবি বাস্তবে রূপ পায় কি না। নির্বাচনের আগে এমন উচ্চকণ্ঠ দাবি নতুন কিছু নয়। কিন্তু তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের ভোট সবসময়ই চমকপ্রদ ফলাফলের জন্য পরিচিত। তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমীকরণ বদলানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BJP Sankalp Patra Bengal, Amit Shah Kolkata Visit | ২৮ মার্চ ‘শাহি’ ছোঁয়ায় বিজেপির সঙ্কল্পপত্র প্রকাশ, ভোটের আগে বড় কৌশল




