সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নির্বাচনী প্রচারের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল ইলেকশন কমিশন (Election Commission of India)। ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং অপ্রমাণিত তথ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনতে একগুচ্ছ নতুন নিয়ম জারি করেছে কমিশন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এবার থেকে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই নিজেদের সমস্ত সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য হলফনামার মাধ্যমে জানাতে হবে। শুক্রবার প্রকাশিত নির্দেশিকায় কমিশন জানিয়েছে, ‘প্রার্থীদের জানাতে হবে তাঁদের কতগুলি অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে, কোন কোন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় এবং সেই অ্যাকাউন্টগুলির প্রকৃতি কী।’ অর্থাৎ, ফেসবুক, এক্স (পূর্বতন টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব-সহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে থাকা অ্যাকাউন্টের পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচন চলাকালীন ডিজিটাল প্রচারের উপর সরাসরি নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
কমিশনের অভিমত, ‘ভোটের সময় ভুয়ো প্রচার সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।’ বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভুয়ো প্রোফাইল বা অচেনা অ্যাকাউন্ট থেকে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়, যার উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন নিয়ম চালু হলে এই ধরনের কার্যকলাপ চিহ্নিত করা সহজ হবে বলেই মনে করছে কমিশন। শুধু প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই উদ্যোগ। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়েও কড়া নির্দেশ জারি হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ‘কোনও রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক।’ অনুমোদন ছাড়া ইন্টারনেট বা সমাজমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিলে তা সরাসরি নিয়মভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে মিডিয়া সার্টিফিকেশন অ্যান্ড মনিটরিং কমিটি বা এমসিএমসি (Media Certification and Monitoring Committee)-র উপর। জেলার স্তরে এই কমিটির কাছে আবেদন জানাতে পারবেন প্রার্থীরা। স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন করতে হবে। কমিশনের ভাষায়, ‘বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু যাচাই করে তবেই অনুমোদন দেওয়া হবে, যাতে কোনও বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে না পড়ে।’
যদি কোনও প্রার্থী বা দল এমসিএমসি-র সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হন, সে ক্ষেত্রে আপিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (Chief Electoral Officer) নেতৃত্বে একটি আপিল কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন। কমিশন আরও জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যমে ‘পেইড নিউজ’ নিয়েও কড়া নজরদারি চালানো হবে। অর্থের বিনিময়ে কোনও সংবাদ প্রকাশ করা হলে তা শনাক্ত করতে এমসিএমসি সক্রিয় থাকবে। এর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারে অস্বচ্ছ আর্থিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীদের শুধু মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তথ্য দিলেই চলবে না, ভোটের পরেও তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ৭৫ দিনের মধ্যে সমস্ত প্রচারের খরচের হিসাব জমা দিতে হবে কমিশনের কাছে। এর মধ্যে ডিজিটাল প্রচারের খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে সমাজমাধ্যমে করা প্রচারের আর্থিক দিকটিও নজরদারির আওতায় আসছে। এই সিদ্ধান্তের আগে কমিশন একাধিক বৈঠক করেছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, পুলিশ নোডাল অফিসার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকরা। পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজমাধ্যম সংস্থার প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন। মূলত ভুয়ো খবর কী ভাবে ছড়ায় এবং তা রোধের উপায় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
কমিশনের একটি সূত্রের বক্তব্য, ‘ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়।’ এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতেই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রচারের দ্রুত বিস্তারের কারণে এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এ বার পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় ভোটগ্রহণ হবে, ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল। মোট ২৯৪টি আসনে ভোট হবে এবং ফল প্রকাশিত হবে ৪ মে। বহু দিন পরে এত কম দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। কমিশন আগেই জানিয়েছিল, দফা কম হলেও নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হয়, সে বিষয়ে তারা নজর রাখছে। এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। প্রার্থীদের ডিজিটাল উপস্থিতি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হবে। ফলে অজ্ঞাত পরিচয়ে প্রচার চালানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বাড়বে। ভোটের আগে এই ধরনের কঠোর নিয়ম রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই তার উপর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ নজর কেড়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nabanna FIR, Election Commission directive | নবান্নের বড় পদক্ষেপ: কমিশনের সময়সীমা মেনেই চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর, চিঠিতে জানালেন নন্দিনী চক্রবর্তী




