সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) জানিয়ে দিল, ভোটার তালিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে সুজয় পাল (Sujay Paul) -এর নেতৃত্বে থাকা কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর উপরেই। অর্থাৎ বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR) সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় বিচার করবেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। একই সঙ্গে অভিযোগ ও আপত্তি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনের কথাও জানিয়েছে আদালত। এই মামলায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy)। ভোটার তালিকা থেকে বহু মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল রাজ্য সরকার। তবে সেই আবেদনের শুনানিতে রাজ্যের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে উপস্থিত প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant) শুনানির সময় রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা কাজ করছেন। তাঁদের তদারকির প্রক্রিয়া চলাকালীন এই ধরনের আবেদন করা ঠিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাঁরা নিযুক্ত রয়েছেন, তাঁদের কাজ নিয়ে অযথা প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।’ আদালত এও সতর্ক করে দেয় যে, বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হলে জরিমানার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে রাজ্যের পক্ষ থেকে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy) স্পষ্ট করেন যে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কাজ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এখনও বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ বাকি রয়েছে এবং সেই বিষয়টি আদালতের নজরে আনা জরুরি। উল্লেখ্য, শুনানির সময় রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখনও প্রায় ৫৭ লক্ষ ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। তবে এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর প্রধান বিচারপতি ইতিমধ্যেই শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছেন যে ১০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant) শুনানিতে বলেন, ‘হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি আমাদের জানিয়েছেন যে ১০ লক্ষেরও বেশি মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। সেই প্রক্রিয়া চলাকালীন আবার নতুন করে আবেদন করা ঠিক নয়।’ শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
এদিকে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দ্রুত অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, প্রকৃত এবং বৈধ ভোটারদের নাম যাতে কোনওভাবেই বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার জানায়, ‘বৈধ ভোটারের নাম কখনওই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।’ আদালত জানায়, এই বিষয়টি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরাই খতিয়ে দেখছেন এবং তাঁদের উপরেই সেই দায়িত্ব বর্তায়। শুনানির সময় রাজ্যের আরেক আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) জানান, সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়া উচিত। এই প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিক সহমত জানায় আদালত। তবে একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত জানায়, এখনও পর্যন্ত নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। তাই এই বিষয়ে তড়িঘড়ি নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। বেঞ্চ জানায়, ‘আগে নির্বাচন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হোক, তারপর প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে।’ পাশাপাশি আদালত আরও জানায়, পূর্বে দেওয়া নির্দেশগুলি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত।
এই সময় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনজীবী শেষাদ্রি নায়ডু (Seshadri Naidu) আদালতে জানান, কমিশন ইতিমধ্যেই আদালতের নির্দেশ মেনে কাজ করছে। তবে শুনানির সময় রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant)। শুনানির শেষে সুপ্রিম কোর্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujay Paul) শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছেন যে ইতিমধ্যে ১০ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এই যাচাই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক বিচারবিভাগীয় আধিকারিক কাজ করছেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৫০০-এরও বেশি এবং ওড়িশা (Odisha) ও ঝাড়খণ্ড (Jharkhand) থেকে প্রায় ২০০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক এই কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। তবে আদালত জানায়, প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে কাজের গতি ব্যাহত হয়েছে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের জন্য যে লগইন আইডি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে কিছু ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আদালতের মতে, এটি নির্বাচন কমিশনের স্তরে একটি ‘ভুলের কারণে’ ঘটেছে। এই বিষয়ে কমিশন আদালতকে আশ্বাস দিয়েছে যে খুব দ্রুত প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ‘কলকাতা হাই কোর্ট এবং বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা যাতে নির্বিঘ্নে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে।’ একই সঙ্গে এই কাজে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারকেও।
আদালত আরও জানায়, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির অনুমতি ছাড়া নির্বাচন কমিশন এমন কোনও বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে না, যাতে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হল একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে না। এই কারণে একটি ট্রাইবুনাল গঠন করা হবে, যেখানে একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং হাই কোর্টের দুই বা তিন জন বিচারপতি থাকবেন। কারা এই ট্রাইবুনালে থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন সুজয় পাল (Sujay Paul) নিজেই। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আপত্তি বা আবেদন এই ট্রাইবুনালের কাছেই জমা দেওয়া যাবে। এছাড়াও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আবেদন সরাসরি কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে জানানো যেতে পারে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
শুনানির পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) বলেন, ‘১০ লক্ষেরও বেশি মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পরও এখনও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট আগেই নির্দেশ দিয়েছিল ধারাবাহিকভাবে সেই তালিকা প্রকাশ করতে হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘আজ আদালত আমাদের বলেছে এই বিষয়ে সরাসরি কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করতে। তিনি বিষয়টি বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন।’
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে চলা এই আইনি লড়াই এখন নতুন মোড় নিয়েছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) -এর প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujay Paul) -এর উপরেই। ফলে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এই মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ এখন রাজনৈতিক মহলেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Supreme Court SIR Hearing | ভোটার তালিকা সংশোধন বিতর্কে বড় মোড়, সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ রাজ্যের বিরুদ্ধে




