শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ক্রিকেটের ইতিহাসে অনেক সময়ই দেখা যায়, ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে পাশে সরিয়ে রেখে দেশের হয়ে লড়াই করেছেন খেলোয়াড়েরা। সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে এমনই এক অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তার নজির গড়লেন ভারতীয় ক্রিকেটার ঈশান কিশান (Ishan Kishan)। ম্যাচের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে একটি ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর তুতো দিদি ও জামাইবাবুর। পরিবারে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। তবুও দেশের হয়ে ফাইনাল খেলতে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ভারতের বিশ্বজয়ে বড় অবদান রাখেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে শুক্রবার ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ঈশানের তুতো দিদি এবং তাঁর স্বামী। পরিবারের কাছে এটি ছিল এক ভয়াবহ আঘাত। এই খবর পাওয়ার পর পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ঈশানের বাবাও ফাইনাল ম্যাচ দেখতে আহমেদাবাদে যেতে পারেননি। ঈশানের বাবা প্রণব পাণ্ডে (Pranab Pandey) সেই সময় সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘আমাদের পরিবারে খুবই খারাপ একটা ঘটনা ঘটেছে। আমরা সবাই গভীর শোকের মধ্যে আছি। এই অবস্থায় আমি বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে যেতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঈশান প্রথমে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের হয়ে ফাইনাল খেলার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলেছে। ওর মনও খুব খারাপ।’
এই কঠিন মানসিক অবস্থার ছাপ দেখা গিয়েছিল ফাইনালের আগের অনুশীলনেও। সাধারণত দলের অনুশীলনের সময় ঈশানকে বেশ প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি দেখা যায়। সতীর্থদের সঙ্গে মজা করা বা হালকা খুনসুটি করা তাঁর স্বভাব। কিন্তু সেই দিন অনুশীলনে যেন সম্পূর্ণ অন্য এক ঈশানকে দেখেছিলেন সতীর্থরা। দলের একাধিক সদস্য পরে জানিয়েছেন, ফাইনালের আগের প্র্যাকটিস সেশনে ঈশানকে বেশ গম্ভীর এবং মনমরা দেখাচ্ছিল। তিনি খুব কম কথা বলছিলেন এবং নিজের মধ্যেই ডুবে ছিলেন। ব্যাটিং অনুশীলন শেষ হওয়ার পর দলের কয়েকজন ক্রিকেটার তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলেন এবং মানসিকভাবে তাঁকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেন। ব্যক্তিগত জীবনের সেই গভীর শোক মাঠে কোনওভাবেই প্রভাব ফেলতে দেননি এই তরুণ ক্রিকেটার। ফাইনাল ম্যাচে তিন নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে নামেন ঈশান। শুরু থেকেই তাঁর ব্যাটে দেখা যায় আক্রমণাত্মক মনোভাব। প্রথম বল থেকেই প্রতিপক্ষ বোলারদের উপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেন তিনি।

মাত্র ২৫ বলেই ৫৪ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন ঈশান। তাঁর ইনিংসে ছিল চারটি চার এবং চারটি ছক্কা। এই দ্রুতগতির রানই ভারতের ইনিংসকে শক্ত ভিত গড়ে দেয়। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে ঈশানের এই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুধু ব্যাট হাতে নয়, ফিল্ডিংয়েও অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান তিনি। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনটি কঠিন ক্যাচ নেন ঈশান। নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) ব্যাটার টিম সেইফার্ট (Tim Seifert), রাচিন রবীন্দ্র (Rachin Ravindra) এবং ড্যারিল মিচেল (Daryl Mitchell)-এর ক্যাচ ধরে প্রতিপক্ষের লড়াই তিনি অনেকটাই কঠিন করে দেন।

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই তিনটি ক্যাচ ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল। যদি ওই ক্যাচগুলি মিস হত, তাহলে হয়ত নিউজিল্যান্ড ম্যাচে আরও কিছুটা সময় লড়াই চালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ঈশানের ফিল্ডিং দক্ষতা ভারতের জয়ের পথ আরও সহজ করে দেয়। ভারত যখন বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে নেয়, তখন সেই আনন্দের মুহূর্তেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ঈশান। তিনি জানান, এই জয় তিনি তাঁর প্রয়াত দিদি ও জামাইবাবুর স্মৃতিকে উৎসর্গ করছেন। তাঁর কথায়, ‘এই জয় আমার পরিবারের জন্য। বিশেষ করে আমার দিদি এবং জামাইবাবুর জন্য।’ ভারতীয় ক্রিকেটে এর আগে এমনই এক দায়িত্ববোধের নজির দেখা গিয়েছিল আরেক তরুণ ক্রিকেটার রিঙ্কু সিং (Rinku Singh) -এর ক্ষেত্রেও। বিশ্বকাপ চলাকালীন তাঁর বাবা প্রয়াত হন। পরিবারের শোক সামলে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পর আবার দলের সঙ্গে তিনি যোগ দেন। দেশের হয়ে খেলার প্রতি তাঁর সেই দায়বদ্ধতা ক্রিকেট মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ঈশান কিশানের ঘটনাও অনেকটা সেই একই মানসিক শক্তির উদাহরণ। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোকের মধ্যেও দেশের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। খেলাধুলার জগতে এমন উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়।
ক্রিকেটপ্রেমীদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ঈশানের এই মানসিক দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেছেন। অনেকের মতে, একজন সত্যিকারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের চরিত্র ঠিক এমনই হয়, যিনি ব্যক্তিগত কষ্টের মধ্যেও দেশের জন্য নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারতের ড্রেসিংরুমে যখন উৎসবের আবহ, তখনও ঈশানের চোখে ছিল আবেগের ছাপ। কারণ এই জয়ের আনন্দের মধ্যেই মিশে ছিল ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বেদনা। কিন্তু সেই বেদনা সত্ত্বেও দেশের জন্য লড়াই করার যে মানসিক শক্তি তিনি দেখিয়েছেন, তা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ishan Kishan wedding update, Aditi Hundia Miss Diva 2018 | পাকিস্তান ম্যাচের নায়ক ঈশানের জীবনে নতুন ইনিংস? বিশ্বকাপ শেষে বিয়ের জল্পনা তুঙ্গে, মডেল অদিতির নাম জানালেন দাদু




