সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশের রাজধানী দিল্লিতে (Delhi) আবারও উত্তর-পূর্ব ভারতের একজন তরুণীকে হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিল্লির সাকেত জেলা আদালতের (Saket District Court) কাছের একটি পার্কে মণিপুরের একজন তরুণীকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে কয়েকজন কিশোরের বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ করতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। তরুণীকে মারধর করে অভিযুক্তেরা পালিয়ে যায় বলে দাবি। ঘটনার তদন্ত শুরু করে দিল্লি পুলিশ, এবং শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত চার কিশোরকেই আটক করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, রবিবার সন্ধ্যায় ওই তরুণী তাঁর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে পার্কে সময় কাটাতে গিয়েছিলেন। সেই সময় কয়েকজন কিশোর তাঁদের দিকে তাকিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং অঙ্গভঙ্গি করতে শুরু করে। অভিযোগ, প্রথমে তাঁরা বিষয়টি উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেও পরে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। তরুণী প্রতিবাদ জানাতেই অভিযুক্তেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কিশোরদের সঙ্গে তরুণীর তর্কাতর্কি শুরু হয়। এরপরেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর অভিযুক্তেরা দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ওই তরুণীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তরুণীকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় দিল্লির পরিচিত হাসপাতালে। সেখানে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাঁর আঘাত গুরুতর নয় এবং চিকিৎসার পর দ্রুতই তাঁকে ছুটি দেওয়া হতে পারে। ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক নেতা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন ব্রীজেন সিং (N. Biren Singh) সমাজমাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই ধরনের জাতিবিদ্বেষমূলক আচরণের কোনও জায়গা আমাদের সমাজে নেই। দেশের প্রতিটি প্রান্তে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের নিরাপদে বসবাস করার অধিকার রয়েছে।’ একই ভাবে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী Conrad Sangma-ও এই ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দিল্লির প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। সমাজমাধ্যমে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে ট্যাগ করে তিনি লেখেন, ‘উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের উপর বারবার হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাকেত আদালতের কাছের এই হামলা জাতিবিদ্বেষের উদাহরণ। এমন আচরণকে কোনওভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পরই দিল্লি পুলিশ দ্রুত তদন্তে নামে। সোমবার দুপুরে পুলিশ প্রথমে একজন কিশোরকে আটক করার কথা জানায়। পরে বিকেলে আরও তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে চার অভিযুক্তকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী আধিকারিকেরা। পুলিশ আরও সূত্রে খবর, অভিযুক্তরা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কিশোর বিচার আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও রেকর্ড করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে রাজধানীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি। অতীতেও দিল্লিতে একাধিকবার এমন অভিযোগ উঠেছে। কয়েক দিন আগেই দিল্লির মালব্যনগর এলাকায় উত্তর-পূর্ব ভারতের তিন তরুণীর বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে এক দম্পতির বিরুদ্ধে।
সেই ঘটনায় আক্রান্ত তিন তরুণী ছিলেন অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু (Kiren Rijiju) এবং অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী প্রেমা খাণ্ডু (Pema Khandu)। তাঁরা স্পষ্ট বার্তা দেন যে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের বৈষম্য বা জাতিবিদ্বেষমূলক আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজধানীতে এমন ঘটনা বারবার সামনে আসা উদ্বেগজনক। উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু তরুণ-তরুণী পড়াশোনা, চাকরি বা অন্যান্য কারণে দিল্লিতে বসবাস করেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করছেন অনেকে। মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের মত, এই ধরনের ঘটনা কেবল আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, তা সমাজের মানসিকতার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁদের মতে, জাতিগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করার শিক্ষা সমাজে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সূত্রের খবর, ঘটনার তদন্ত চলছে। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘এই ধরনের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ পুলিশ আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। কিন্তু, রাজধানীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কারণ ভারতের বৈচিত্র্যের অন্যতম শক্তি হল বিভিন্ন সংস্কৃতি ও অঞ্চলের মানুষের সহাবস্থান, আর সেই মূল্যবোধ রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Delhi High Court observation, promise of marriage case India | কুষ্ঠি ইস্যুতে বিয়ে ভাঙা চলবে না, দিল্লি হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ



