সাশ্রয় নিউজ ★ বাঁকুড়া : একসময় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে তৈরি হয়েছিল রেলস্টেশন। উদ্বোধনের সময় আশা ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে বদলে যাবে গোটা এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা। কিন্তু প্রায় দেড় দশক কেটে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। মাত্র চারটি ট্রেনের স্টপেজ নিয়েই পড়ে রয়েছে স্টেশনটি। ফলে ক্ষোভে ফুঁসছে বাঁকুড়া জেলার ওন্দা ব্লকের কয়েক ডজন গ্রাম। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি গ্রামের মানুষ এখন জোরদার আন্দোলনের পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। কারণ, স্টেশনটি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া। তাঁর প্রচেষ্টাতেই ২০১০ সালে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আদ্রা-খড়গপুর শাখায় কালিসেন এলাকায় স্টেশন নির্মাণ করা হয়। সেই সময় আপ ও ডাউন মিলিয়ে চারটি ট্রেনের স্টপেজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্থানীয়দের আশা ছিল, ভবিষ্যতে আরও ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। কিন্তু অভিযোগ, ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখনো পর্যন্ত নতুন করে একটি ট্রেনেরও স্টপেজ মেলেনি। অথচ এই সময়ের মধ্যে ওই রুটে ট্রেনের সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তবু কালিসেন স্টেশন যেন সময়ের স্রোতে পিছিয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্টেশনটি মূলত বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের কালিসেন, মুড়াকাটা, মনিপুর, শালিহান-সহ প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি গ্রামের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা বা ব্যবসার প্রয়োজনে ট্রেনে যাতায়াত করেন। কিন্তু স্টপেজ কম থাকায় তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়। একজন বাসিন্দার কথায়, ‘স্টেশন তৈরি হওয়ার সময় আমরা ভেবেছিলাম যোগাযোগের সুবিধা বাড়বে। কিন্তু আজও চারটি ট্রেনই থামে। তাও আবার এমন সময়ে যে অনেকের কাজে লাগে না। ফলে অনেক সময় দূরের স্টেশনে যেতে হয়।’ বাসিন্দাদের ভেতর থেকে অভিযোগ উঠেছে, গত দেড় দশকে বহুবার ভোট এসেছে, লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত নির্বাচন মিলিয়ে অন্তত নয়টি নির্বাচন হয়েছে। প্রতিবারই রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থীরা এলাকায় এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে কালিসেন স্টেশনে আরও ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হবে। কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার পর আর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এক গ্রামবাসীর বক্তব্য, ‘প্রতি নির্বাচনের সময় নেতারা এসে বলেন স্টপেজ বাড়বে। কিন্তু ভোট হয়ে গেলে আর কেউ খোঁজ নেন না। আমরা বহুবার সাংসদ, বিধায়ক এবং রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।’
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে যে চারটি ট্রেন থামে, সেগুলির সময়সূচি এমন যে অধিকাংশ মানুষের কাজে আসে না। অনেক ক্ষেত্রে অফিস বা স্কুলের সময়ের সঙ্গে মিল থাকে না। ফলে যাত্রীদের বাধ্য হয়ে অন্য স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে হয়। এই পরিস্থিতিতে এলাকার মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার আন্দোলনের পথে নামতেই হবে। স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা ইতিমধ্যে বৈঠক করে কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছেন। দাবি না মানা হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। একজন সংগঠক জানান, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের দাবি জানাব। স্টপেজ বাড়ানো না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হব।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি আগামী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এই স্টেশনকে কেন্দ্র করে বহু গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত নির্ভর করে। ফলে ভোটের আগে এই দাবিকে ঘিরে রাজনৈতিক তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন দূরের কলেজে পড়তে যান। কর্মজীবীরাও শহরে কাজ করতে যান। তাঁদের জন্য ট্রেনই সবচেয়ে সস্তা ও সহজ পরিবহণ মাধ্যম। একজন শিক্ষক বলেন, ‘যদি আরও ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হয়, তাহলে এলাকার ছাত্রছাত্রীদের অনেক সুবিধা হবে। এখন অনেক সময় ট্রেনের অভাবে ক্লাস মিস করতে হয়।’ রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন স্টপেজ চালু করার জন্য যাত্রীসংখ্যা, সময়সূচী, লাইনের চাপ এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়। তবে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি থাকলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব। এদিকে এলাকার মানুষ এখন তাকিয়ে রয়েছেন প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষের দিকে। তাঁদের আশা, বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কালিসেন স্টেশনে আরও ট্রেনের স্টপেজ দেওয়া হবে। যদি তা না হয়, তাহলে আন্দোলনের পথে নামতে পিছপা হবেন না বলেই জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের কথায়, ‘১৫ বছর অপেক্ষা করেছি। এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Anganwadi worker protest Kolkata | ‘এক মাস মাইনে দেয়, এক মাস দেয় না’ : ভাতা, কাজের চাপ ও মোবাইলের দাবিতে উত্তাল কলকাতা, রাজপথে অঙ্গনওয়ারি কর্মীদের ক্ষোভ



