স্নিগ্ধা বসু, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বলিউডের আকাশে একসময়ের উজ্জ্বল তারা ছিলেন সুলক্ষণা পণ্ডিত (Sulakshana Pandit)। সত্তরের দশকে একদিকে তাঁর মিষ্টি হাসি আর সংবেদনশীল অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করেছিলেন, অন্যদিকে জীবনের শেষে রেখে গেলেন এক হৃদয়বিদারক কাহিনি। গত বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই অভিনেত্রী। বয়স হয়েছিল মাত্র ৬৮। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই প্রয়াত হন সুলক্ষণা। কিন্তু মৃত্যুর তারিখ যেন ভাগ্যের এক ভয়ানক কৌতুক! কারণ ৬ নভেম্বরই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ভালবাসা, অভিনেতা সঞ্জীব কুমারেরও (Sanjeev Kumar)।

সুলক্ষণা ছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীত পরিবার ‘পণ্ডিত’ পরিবারের কন্যা। তিনি জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক জুটি যতীন-ললিতের (Jatin-Lalit) দিদি এবং অভিনেত্রী বিজয়েতা পণ্ডিতের (Vijeta Pandit) বোন। সেই ঘর থেকেই সংগীত ও শিল্পের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। সাতের দশকে বলিউডে আত্মপ্রকাশ ঘটে সুলক্ষণার। প্রথম ছবি ‘উলঝন’ (Uljhan)। সেই ছবিতেই দর্শকরা চিনে নেয় এক নতুন মুখ সংবেদনশীল, স্নিগ্ধ, অথচ দৃঢ়চেতা এক অভিনেত্রী। এরপর ‘সঙ্কোচ’ (Sankoch), ‘হেরাফেরি’ (Hera Pheri), ‘অপনাপন’ (Apnapan) -এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে স্থায়ী করে নেন তিনি। পরিচালকরা বলতেন, “সুলক্ষণা ছিলেন এমন এক অভিনেত্রী, তিনি দৃশ্যকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন তাঁর চোখের ভাষায়।”
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল প্রেমের গল্প। অভিনেতা সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে সম্পর্কের কাহিনি। একতরফা এই প্রেম বলিউডের ইতিহাসে এক গভীর বিষণ্ণতা রেখে গেছে। সঞ্জীব কুমার, যিনি নিজে ছিলেন এক জটিল, অন্তর্মুখী মানুষ, ভালোবেসেছিলেন ‘ড্রিম গার্ল’ হেমা মালিনীকে (Hema Malini)। কিন্তু হেমা স্পষ্টভাবে তাঁর প্রেমপ্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আঘাতে সঞ্জীব মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই সময়েই সুলক্ষণা তাঁকে ভালবেসে ফেলেন। তাঁর প্রেম ছিল নিষ্ঠার, ছিল পূজার। বহু বছর পরে সুলক্ষণা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ওঁর (সঞ্জীবের) চোখের ক্লান্তি আমি বুঝতাম, ওঁর নীরবতাই ছিল আমার কাছে ভালবাসার প্রকাশ।” বলিউডের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, একদিন মন্দিরে দাঁড়িয়ে সুলক্ষণা নাকি সঞ্জীবকে বলেছিলেন, “আমাকে সিঁদুর পরাও… আমায় বিয়ে করো।” সেই সময় সঞ্জীব গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি জানতেন তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই সেদিন বিয়ে না করে, চুপচাপ সরে দাঁড়ান তিনি।

সুলক্ষণা নাকি তখন থেকেই মনেপ্রাণে তাঁকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। তিনি আজীবন আর বিয়ে করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের কথায়, “আমার জীবন তো ওঁর সঙ্গেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওঁর পর কেউ আর জায়গা নিতে পারেনি।” সঞ্জীব কুমারের মৃত্যুর পর সুলক্ষণা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে সিনেমা থেকে সরে আসেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে থেকেও যেন এক অনন্ত শূন্যতায় হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। গানের জগতে তাঁর কণ্ঠের দখল ছিল অপূর্ব। কিশোর কুমার (Kishore Kumar) -এর সঙ্গে ডুয়েট গানও করেছেন, কিন্তু মনের ভেতরের অন্ধকার কাটেনি।
নিয়তি যেন তাঁর জীবনের প্রতি ছিল নির্মম। ৬ নভেম্বর, সঞ্জীব কুমারের প্রয়াণ দিবসে, তিনিও নিজে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। এই ঘটনাকে বলিউডের অনেকেই ‘divine connection’ বলছেন। অভিনেত্রী বিজয়েতা পণ্ডিত সংবাদমাধ্যমে জানান, “দিদি কখনও সঞ্জীবজিকে ভুলতে পারেননি। হয়তো সেই কারণেই ঈশ্বরও ওঁদের পুনর্মিলন ঘটালেন এই দিনে।” উল্লেখ্য, সুলক্ষণা পণ্ডিতের জীবন যেন বলিউডীয় রোমান্সের এক মর্মান্তিক জায়গা। যেখানে ভালবাসা আছে, ত্যাগ আছে, আর আছে অসমাপ্তির এক দীর্ঘশ্বাস। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বহু অভিনেতা ও সংগীত শিল্পী। সংগীত পরিচালক যতীন পণ্ডিত (Jatin Pandit) বলেছেন, “দিদির জীবনটাই ছিল একটা সুর- যেটা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।” জীবনের শেষ অধ্যায়ে সুলক্ষণা প্রায় নিঃসঙ্গভাবে দিন কাটাতেন। কিন্তু যাঁরা তাঁর কাছের ছিলেন, তাঁরা জানতেন, মনের গভীরে আজও বেঁচে ছিলেন সেই ‘সঞ্জীব’। হয়ত মৃত্যুর পর তাঁদের দু’জনের দেখা সত্যিই হয়ে গেল, কোনও এক শান্ত, অশরীরী পৃথিবীতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Arjun Kapoor mother birthday post, Malaika Arora reaction | মায়ের জন্মদিনে অর্জুন কাপুরের আবেগঘন স্বীকারোক্তি, পোস্ট দেখেই যে প্রতিক্রিয়া দিলেন মালাইকা



