সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ইডেন গার্ডেন্সের আলোঝলমলে সন্ধ্যায় একটি ইনিংস বদলে দিল সমীকরণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে মরণবাঁচন ম্যাচে ৫০ বলে ৯৭ রানের অপরাজিত ঝড় তুলে ম্যাচের শেষে পিচের উপর বসে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানান সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson)। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন পোস্ট: ‘সকলের কাছে পৌঁছতে চাইছি… যাঁরা আমায় ভালবাসা দিয়েছেন, সমর্থন করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনারা আমার জন্য প্রার্থনা করুন… ভারতীয় দলকে আর দু’পা এগোতে হবে।’ ইডেনের সেই রাতের পর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সঞ্জু। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ়ে ব্যাটে রান না আসায় প্রথম একাদশে জায়গা হারাতে হয়েছিল সঞ্জুকে। হেড কোচ গৌতম গম্ভীর দলগঠনে ভিন্ন কৌশল নেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঝপথে পরিস্থিতি পাল্টায়। অভিষেক শর্মা ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারা এবং রিঙ্কু সিংহ-এর পারিবারিক শোক এই দুই কারণে টিম ম্যানেজমেন্ট সঞ্জুর অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রাখে। সুযোগ পেয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, বড় মঞ্চে কীভাবে স্নায়ুর চাপ সামলাতে হয়।

সুপার এইটে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ১৫ বলে ২৪ রান করে শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও বড় স্কোরে রূপান্তরিত করতে পারেননি। সমালোচনা তখনও থামেনি। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ইডেনের লড়াই ছিল ‘করো অথবা মরো’ ম্যাচ। সেখানেই সঞ্জুর ব্যাট থেকে আসে ৯৭*। যেখানে ছিল কভার ড্রাইভ, পুল, স্কুপ আর নিখুঁত টাইমিংয়ের প্রদর্শনী। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে তাঁর আচরণ নজর কাড়ে। হাঁটু গেড়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান। পরে সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘যে ভাবে আপনাদের ভালবাসা পাচ্ছি, সেটা আমার কাছে অনেক কিছু… আমি শুধু সকলকে একটাই কথা বলতে চাই, ধন্যবাদ।’ সঙ্গে পোস্ট করেন নিজের একটি ছবি। কথায় বোঝা যায়, লক্ষ্য এখন সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। ‘ভারতীয় দলকে আর দু’পা এগোতে হবে’ এই লাইনেই ধরা পড়েছে তাঁর মানসিক প্রস্তুতি।
ইডেন গার্ডেন্স, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ, বহু স্মরণীয় ইনিংসের সাক্ষী। সেই তালিকায় যুক্ত হল সঞ্জুর ৯৭*। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৫০ বলে ৯৭ সংখ্যাটা যেমন বড়, পরিস্থিতির গুরুত্বও তেমনই ছিল। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে ইনিংস গড়া এবং শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এই দুই দিক থেকেই ম্যাচটি তাঁর কেরিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ। সমর্থকদের প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজমাধ্যমে প্রশংসার ঢেউ। অনেকেই লিখেছেন, ‘এটাই সঞ্জুর আসল রূপ।’ কেউ কেউ মনে করিয়ে দিয়েছেন, সুযোগ পেলে তিনি বারবার নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলে ওঠানামা, একাদশে অনিশ্চয়তা, সব কিছুর মাঝেও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়। ইডেনের ইনিংস সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রকাশ। দলের ভেতরেও প্রভাব পড়েছে। টপ অর্ডারে স্থিতি এনে মিডল অর্ডারকে স্বাধীনতা দিয়েছেন তিনি। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ভারসাম্য তৈরি করেছে। আগ্রাসন ও ধৈর্যের মিশেল এই ইনিংসে দু’টিই দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে ডেথ ওভারে তাঁর শট নির্বাচন ছিল কৌশলী।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন ভারতের সামনে সেমিফাইনালের চ্যালেঞ্জ। সঞ্জুর পোস্টে সেই লক্ষ্যই ধরা পড়েছে। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের অগ্রগতিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। ‘প্রার্থনা করুন’ এই অনুরোধে সমর্থকদের সঙ্গে একাত্মতার সুর। ক্রিকেট যে কেবল ব্যাট-বলের খেলা নয়, মানসিক শক্তিরও বড় পরীক্ষা, ইডেনের সেই রাত যেন সেই কথাই মনে করাল। আগামী ম্যাচগুলিতে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। স্পিন ও পেস দু’ধরনের আক্রমণ সামলাতে পারদর্শী। ইডেনের ৯৭* ইনিংস হয়ত টুর্নামেন্টের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যদি ভারত ট্রফির দিকে এগোয়। উল্লেখ্য, সঞ্জু স্যামসনের ক্রিকেটযাত্রা উত্থান-পতনে ভরা। কখনও একাদশে, কখনও বাইরে। কিন্তু ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটিং প্রমাণ করল, বড় ম্যাচে তিনি তৈরি। এখন নজর সেমিফাইনালে। সমর্থকদের প্রত্যাশা, সঞ্জুর ব্যাট আরও একবার জ্বলে উঠুক, আর ভারত এগিয়ে যাক সেই কাঙ্ক্ষিত শেষ ধাপের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sanju Samson’s 97* Powers India to T20 World Cup Semifinal with Record Chase at Eden Gardens | বড় ম্যাচে বড় ইনিংস, ইডেনে সঞ্জুর দাপটে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল




