সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা: রাত পোহালেই প্রকাশ্যে আসতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত SIR তালিকা। রাজ্যের ভোটারদের জন্য এটি হতে পারে বড় মোড়বদলের মুহূর্ত। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রকাশিত তালিকায় মোট প্রায় ৭ কোটি ৮০ লক্ষ নাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই তালিকা তিনটি পৃথক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, ‘অ্যাপ্রুভড’, ‘ডিলিটেড’ এবং ‘অমীমাংসিত’। এর মধ্যে অমীমাংসিত নামের সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ ছুঁইছুঁই, যা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ ভোটার—সবার মধ্যেই কৌতূহল ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (Manoj Agarwal) জানিয়েছেন, ‘যে তালিকাটা বেরোবে, তাতে ৭ কোটি ৮০ লক্ষের নাম থাকবে। তার মধ্যে ডিলিট হওয়া নাম আলাদা করে চিহ্নিত করা হবে। অমীমাংসিতের সংখ্যাটা প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই সংখ্যাই আগামী দিনে ভোটের অঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তালিকা অনুযায়ী, যাঁরা স্ক্রুটিনিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং যাঁদের নথিতে কোনও অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি, তাঁদের নাম ‘অ্যাপ্রুভড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। অন্যদিকে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম ‘ডিলিটেড’ তালিকায় থাকবে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন স্থানান্তরিত ভোটার ও মৃত ব্যক্তিরা। তবে সবচেয়ে বড় নজর রয়েছে সেই ৬০ লক্ষ অমীমাংসিত ভোটারের দিকে, যাঁদের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরা (Judicial Officers) ধাপে ধাপে এই নামগুলির ভাগ্য নির্ধারণ করছেন। নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। জেলা ভিত্তিক অমীমাংসিত ভোটারের পরিসংখ্যানও ইতিমধ্যেই আলোচনায়। মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ৬ লক্ষ নাম অমীমাংসিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় সংখ্যাটি প্রায় ৫ লক্ষ ৯০ হাজার। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৫ লক্ষ ২০ হাজার নাম নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। পশ্চিম মেদিনীপুরে অমীমাংসিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ, আর মেদিনীপুর জেলায় তা প্রায় ৮০ হাজার। কলকাতা শহরেও কম নয় সংখ্যা, উত্তর কলকাতায় প্রায় ৬০ হাজার এবং দক্ষিণ কলকাতায় ৭৮ হাজার নাম এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এই বিপুল সংখ্যক অমীমাংসিত ভোটারের উপস্থিতি আসন্ন নির্বাচনী সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলিতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও নির্বাচন দফতরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সমস্ত প্রক্রিয়া আইনানুগ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।
তালিকা প্রকাশের পর সাধারণ ভোটাররা কীভাবে নিজেদের নাম যাচাই করবেন, সে সম্পর্কেও নির্দেশিকা জারি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অনলাইনে তালিকা দেখা যাবে। পাশাপাশি অফলাইনে জেলাশাসকের কার্যালয়, বিডিও অফিস এবং কমিশন নির্ধারিত অন্যান্য সরকারি দফতরেও সরাসরি গিয়ে নাম খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকবে। ফলে ডিজিটাল ও সরাসরি, দুই পথেই নাগরিকদের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অমীমাংসিত তালিকাভুক্তদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাঁদের নাম তালিকায় থাকবে, তবে পাশে উল্লেখ থাকবে যে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই সমস্যার সমাধান করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থাৎ প্রথম তালিকা প্রকাশই শেষ কথা নয়; প্রক্রিয়া চলবে আরও কিছুদিন।
রাজনৈতিক দলগুলিও ইতিমধ্যে নিজেদের সংগঠনকে সক্রিয় করেছে। বুথ স্তর থেকে ব্লক পর্যায় পর্যন্ত তালিকা খতিয়ে দেখে সম্ভাব্য ত্রুটি চিহ্নিত করার প্রস্তুতি চলছে। কারণ অমীমাংসিত বা ডিলিটেড তালিকায় নাম থাকা মানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে। তাই দ্রুত আপত্তি ও সংশোধনের আবেদন জানানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে ভোটারদের। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সঠিক ও হালনাগাদ তালিকা ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তবে বিপুল সংখ্যক অমীমাংসিত নাম সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের বক্তব্য, প্রতিটি কেস পৃথকভাবে যাচাই করা হচ্ছে এবং আইন মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজ্যে মোট ৭ কোটির বেশি ভোটারের নাম থাকা মানে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর বিশাল দায়িত্ব। তার মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি নাম ঝুলে থাকায় ভোটের অঙ্কে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষত যেসব জেলায় অমীমাংসিত নামের সংখ্যা লক্ষাধিক, সেখানে ফলাফলের ব্যবধানে পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এখন নজর শনিবারের দিকে, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে SIR তালিকা। তারপরই পরিষ্কার হবে কার নাম কোন তালিকায় জায়গা পেয়েছে। ভোটারদের একাংশের কাছে এটি স্বস্তির খবর হতে পারে, আবার অন্য অংশের কাছে তৈরি হতে পারে নতুন উদ্বেগ। গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত মজবুত রাখতে তালিকা প্রকাশ ও সংশোধনের এই প্রক্রিয়া যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Raises Concern Over Final Voter List Amid SIR Row | এসআইআর ইস্যুতে ফের সরব মমতা, ফাইনাল ভোটার লিস্ট নিয়ে আশঙ্কা




