Finland, Wireless Power Transmission | খোলা আকাশেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন! আল্ট্রাসনিক তরঙ্গ, লেজার ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে বিপ্লবী গবেষণায় এগিয়ে ফিনল্যান্ড

SHARE:

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিদ্যুৎ পৌঁছাতে আর তার বা প্লাগের প্রয়োজন নাও হতে পারে, এমন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব। আল্ট্রাসনিক শব্দতরঙ্গ, লেজার সিস্টেম ও রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি প্রযুক্তির সমন্বয়ে খোলা বাতাসের মধ্য দিয়েই বৈদ্যুতিক শক্তি প্রেরণের সম্ভাবনা উন্মোচন করেছেন গবেষকেরা। এই উচ্চাভিলাষী পরীক্ষানিরীক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড (Finland), যেখানে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি সংস্থা ভবিষ্যতের শক্তি ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। ফিনল্যান্ডের University of Helsinki এবং University of Oulu -এর গবেষকদল বেতার বিদ্যুৎ পরিবহণের নানা পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন। তাঁদের অন্যতম উদ্ভাবনী ধারণা হল উচ্চ-তীব্রতার আল্ট্রাসনিক তরঙ্গ ব্যবহার করে বাতাসের মধ্যে সাময়িক কাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট পথে অগ্রসর হতে পারে। গবেষকেরা একে ‘অ্যাকুস্টিক চ্যানেল’ নামে অভিহিত করছেন। এই পদ্ধতিতে তারের বদলে শব্দতরঙ্গই বিদ্যুতের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

Wireless Power Transmission. ছবি : প্রতীকী

গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, শক্তিশালী আল্ট্রাসনিক তরঙ্গ বাতাসের ঘনত্ব ও তাপমাত্রায় ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তন ঘটায়। ফলে একটি নিয়ন্ত্রিত পথ তৈরি হয়, যেখানে বৈদ্যুতিক স্রোত বিচ্যুত না হয়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একজন গবেষক জানিয়েছেন, ‘আমরা এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছি, যেখানে শব্দই বিদ্যুতের জন্য অদৃশ্য সেতু তৈরি করে।’ এই প্রক্রিয়া এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও প্রযুক্তিবিদদের ধারণা, ভবিষ্যতে এটি স্পর্শবিহীন বৈদ্যুতিক সংযোগের পথ খুলে দিতে পারে। শুধু শব্দভিত্তিক প্রযুক্তিই নয়, ফিনল্যান্ডে লেজার-চালিত শক্তি পরিবহণ নিয়েও অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থা উচ্চক্ষমতার লেজার রশ্মি ব্যবহার করে দূরবর্তী রিসিভারে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা উন্নয়ন করছে। এই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীভূত আলোকরশ্মি একটি ফটোভোল্টায়িক রিসিভারে পতিত হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যেখানে বৈদ্যুতিক বিচ্ছিন্নতা অত্যন্ত জরুরি, যেমন পারমাণবিক স্থাপনা বা উচ্চ-ভোল্টেজ অঞ্চল; সেখানে এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। একটি গবেষণা-সংস্থার প্রতিনিধির কথায়, ‘লেজার-ভিত্তিক শক্তি পরিবহণ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিরাপদ বিকল্প তৈরি করতে পারে।’

রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি শক্তি আহরণও এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা তড়িৎচৌম্বকীয় সংকেত সংগ্রহ করে ক্ষুদ্র ডিভাইস চালানোর প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই উন্নয়নের পথে। ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) নির্ভর সেন্সর বা স্বল্পশক্তি সম্পন্ন যন্ত্রে বারবার ব্যাটারি বদলের প্রয়োজন কমাতে পারে এই পদ্ধতি। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ‘রেডিও তরঙ্গ থেকেই শক্তি সংগ্রহ করে ছোট ডিভাইস দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব।’ এর ফলে বর্জ্য ব্যাটারির পরিমাণ কমবে এবং পরিবেশগত প্রভাবও হ্রাস পাবে। এই তিনটি প্রযুক্তির সম্মিলিত অগ্রগতি বিশ্ব শক্তি-বণ্টন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খোলা বাতাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহণ সফল হলে শিল্পক্ষেত্রে তারের জটিল অবকাঠামো অনেকাংশে কমে আসতে পারে। দূরবর্তী বা দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াও সহজ হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-সংযোগের সময় শারীরিক স্পর্শের ঝুঁকি কমে নিরাপত্তা বাড়বে।

শক্তি গবেষণার মানচিত্রে ফিনল্যান্ডের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে এই উদ্ভাবনের ফলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় চলা একাধিক প্রকল্পে এই দেশ ইতিমধ্যেই নবায়নযোগ্য শক্তি ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। এখন বেতার বিদ্যুৎ পরিবহণে সাফল্য পেলে তা বিশ্ববাজারে নতুন শিল্পক্ষেত্রের দ্বার খুলে দিতে পারে। প্রযুক্তি-বিশ্বের পর্যবেক্ষকদের মতে, আল্ট্রাসনিক চ্যানেল, লেজার শক্তি পরিবহণ ও রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি আহরণের সমন্বিত উন্নয়ন আগামী দশকে শক্তি খাতে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম। যদিও বাণিজ্যিক প্রয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তবু প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক। গবেষণাগারে প্রাপ্ত সাফল্য শিল্পক্ষেত্রে রূপ পেলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে। উল্লেখ্য, বর্তমান বিশ্বে শক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তারবিহীন বিদ্যুৎ পরিবহণ প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে স্মার্ট সিটি, স্বয়ংক্রিয় কারখানা এবং উন্নত স্বাস্থ্যপরিসেবায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। প্লাগ, সকেট বা তার ছাড়াই যন্ত্র চালানোর স্বপ্ন আর কল্পবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খোলা আকাশে ভেসে বেড়ানো শক্তিই হয়তো ভবিষ্যতের শক্তির নতুন পরিচয় হয়ে উঠবে।

ছবি : সংগৃহীত।
আরও পড়ুন : Central Observers in Assembly Election | মনোনয়ন পর্ব থেকেই কড়া নজরদারি, বাংলায় ২৯৪ কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন