সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ের রূপকথার যাত্রা যেমন ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দিয়েছে, তেমনই নজর কেড়েছে তাদের অনন্য সমর্থকদল। শ্রীলঙ্কার গ্যালারিতে রঙিন পোশাক, তূর্যধ্বনি, ঢাক-ঢোল আর অবিরাম নাচে-গানে মাতিয়ে রেখেছিল ‘ব্রাস ব্যান্ড’ ও ‘ক্যাসল কর্নার’। কিন্তু সুপার এইট পর্বে ভারতের মাটিতে দল খেলতে নামলে, সেই চেনা মুখগুলি কী দেখা যাবে? আর্থিক অনিশ্চয়তায় তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্নচিহ্ন। উল্লেখ্য, চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ে গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সুপার এইটে জায়গা করে নিয়েছে। ক্রিকেটবিশ্বে এই সাফল্যকে অনেকেই ‘ডার্ক হর্স’-এর উত্থান বলছেন। কিন্তু মাঠের বাইরের লড়াইটা আরও কঠিন। দলের একনিষ্ঠ সমর্থকদের অনেকেই জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় খেলা দেখতে যাওয়াই ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কোনও রকমে অর্থ জোগাড় করে সেখানে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ভারত সফরের ব্যয় বহন করা তাঁদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘ব্রাস ব্যান্ড’ গোষ্ঠীর প্রধান পল মুঙ্গোফা (Paul Mungofa) স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে আবেদন জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা মাঠে থাকলে পরিবেশ বদলে যায়। ক্রিকেটাররা আলাদা উদ্দীপনা পায়। আমরা শুধু দর্শক নই, দলের শক্তি।’ তাঁর কথায়, ‘বিশ্বকাপে ভারত সফরের জন্য থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ও টিকিটের খরচ আমাদের সাধ্যের বাইরে। দেশের ব্যবসায়ী সমাজ যদি পাশে দাঁড়ায়, তবে আমরা গ্যালারিতে থাকতে পারব।’ জিম্বাবোয়ের এই দুই সমর্থকগোষ্ঠী ‘ব্রাস ব্যান্ড’ ও ‘ক্যাসল কর্নার’ দেশটির ক্রিকেট সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তাঁরা শুধু গানই বাজান না, পুরো ম্যাচ জুড়ে দলকে উজ্জীবিত রাখেন। আর একজন সংগঠক মালভিন কোয়ারাম্বা (Malvin Kwaramba) বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচে আমরা ছিলাম। জয়ের সময় আনন্দ করেছি, পরাজয়ে কেঁদেছি। দল আমাদের পরিবার। পরিবারকে সমর্থন করতে আমরা আবারও মাঠে যেতে চাই।’
শ্রীলঙ্কার মাঠে তাঁদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। গ্যালারির এক কোণে লাল-হলুদ-সবুজ পোশাকে সেজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যান্ড বাজিয়ে গেয়েছেন সমর্থকেরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারেও একাধিক বার ধরা পড়েছে তাঁদের উচ্ছ্বাস। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই আবেগই জিম্বাবোয়ের ক্রিকেটকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দলের অধিনায়ক সিকন্দর রাজা (Sikandar Raza) নিজেও সমর্থকদের এই ত্যাগের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওঁরা নিজেদের অর্থে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আমাদের জন্য গলা ফাটাচ্ছেন। তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’ তাঁর মতে, গ্যালারির সেই তূর্যধ্বনি ও সমর্থন ক্রিকেটারদের মনোবল কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রসঙ্গত, এবার সুপার এইটে ভারতের মাটিতে নামবে জিম্বাবোয়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারি চেন্নাইয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, সেই ম্যাচে গ্যালারিতে কী দেখা যাবে ‘ব্রাস ব্যান্ড’ ও ‘ক্যাসল কর্নার’-কে? সমর্থকদের একাংশের বক্তব্য, শ্রীলঙ্কা সফরের খরচ জোগাড় করতেই তাঁরা ধারদেনায় জর্জরিত। ভারতের হোটেলভাড়া, খাবারদাবার, স্থানীয় যাতায়াত, সব নিয়ে ব্যয় বহুগুণ বেশি।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সমর্থক সংস্কৃতির আর্থিক বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। বড় ক্রিকেটশক্তিগুলির সমর্থকেরা যেখানে স্পনসরশিপ বা কর্পোরেট সহায়তা পান, সেখানে জিম্বাবোয়ের মতো দেশের সমর্থকেরা মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বিদেশ সফরে যান। ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবু আশা ছাড়ছেন না পল ও মালভিনরা। তাঁদের বক্তব্য, ‘আমরা ঐতিহ্য বহন করছি। আমাদের পূর্বসূরিরা যেমন ব্যান্ড নিয়ে মাঠ মাতাতেন, আমরাও সেই ধারা বজায় রেখেছি। ভারতেও যদি যেতে পারি, দল আরও শক্তি পাবে।’ তাঁদের এই আবেগ ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে ক্রাউডফান্ডিংয়ের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়, তা আবেগেরও খেলা। জিম্বাবোয়ের এই সমর্থকেরা তার প্রমাণ। আর্থিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাঁদের একটাই লক্ষ্য, দলের পাশে থাকা। এখন দেখার, দেশের ব্যবসায়ী মহল বা কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাঁদের ডাকে সাড়া দেয় কি না। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বে জিম্বাবোয়ের অভিযান কত দূর গড়াবে, তা সময় বলবে। তবে গ্যালারিতে যদি আবার শোনা যায় সেই ব্রাস ব্যান্ডের সুর, তবে তা নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Mann Ki Baat, Indian origin cricketers T20 World Cup | মন কি বাত-এ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভারতীয় বংশোদ্ভূত তারকারা! মোনাঙ্ক, দিলপ্রীতদের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী



