সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নতুন দিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে ভারতের ডিজিটাল বিপ্লবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রঁ (Emmanuel Macron)। বিশেষ করে ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভারত এমন একটি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বের আর কোনও দেশ এই পরিসরে করতে পারেনি।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি।ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’ -এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ম্যাক্রঁ ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার রূপান্তরমূলক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এক দশক আগে মুম্বইয়ের রাস্তার ধারের একজন বিক্রেতার পক্ষে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা কার্যত অসম্ভব ছিল। ঠিকানা নেই, প্রয়োজনীয় নথি নেই, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ নেই। আজ সেই মানুষটিই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ পেমেন্ট গ্রহণ করছেন। এবং এই পরিষেবা সবার জন্য উন্মুক্ত, কার্যত বিনামূল্যে।’
ফরাসি প্রেসিডেন্টের কথায়, ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিশ্বমঞ্চে নজির তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় নির্মাণ, এ এক বিরল সাফল্য। এই মাত্রার অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি বাস্তবায়ন অন্য কোথাও দেখা যায়নি।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আধার-ভিত্তিক পরিচয় ব্যবস্থা ও ইউপিআই-নির্ভর আর্থিক লেনদেনের সমন্বিত কাঠামোর প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-কে ধন্যবাদ জানিয়ে ম্যাক্রঁ বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ এআই সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়ে আমি সম্মানিত। ভারত প্রযুক্তিকে যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছে, তা প্রশংসনীয়।’ আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে ভারতের ডিজিটাল সক্ষমতা যে এখন আলোচনার কেন্দ্রে, তা তাঁর বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার।
উল্লেখ্য, ইউপিআই কেবল একটি পেমেন্ট সিস্টেম নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে বড় কর্পোরেট, সকলের কাছেই এটি সমান কার্যকর। নগদবিহীন লেনদেনের প্রসারে ইউপিআই যে ভূমিকা নিয়েছে, তা ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ম্যাক্রঁর বক্তব্য সেই স্বীকৃতিকেই আরও জোরদার করল। এটি অবশ্য প্রথমবার নয় যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইউপিআই-এর প্রশংসা করলেন। ২০২৪ সালে তাঁর ভারত সফরের সময় জয়পুরে হাওয়া মহলের সামনে এক রাস্তার দোকানে প্রধানমন্ত্রী মোদী ইউপিআই-এর মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করেন। সেই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন ম্যাক্রঁ। পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বোঝান কীভাবে কিউআর কোড স্ক্যান করে মুহূর্তের মধ্যে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয়। গতি, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহার সহজতার বিষয়টি বিশেষভাবে তাঁর নজর কাড়ে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, অচিরেই ফ্রান্সে ভারতীয় পর্যটকেরা ইউপিআই-এর মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারবেন। সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘটে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI) ফরাসি অংশীদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ফ্রান্সে ইউপিআই গ্রহণের পথ সুগম করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার আরও জোরদার হয়।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ইউপিআই-এর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল এর উন্মুক্ত কাঠামো, আন্তঃব্যাঙ্ক সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্যতা। গ্রামাঞ্চল থেকে মহানগর, সব জায়গায় মোবাইলভিত্তিক আর্থিক লেনদেনকে সহজ করেছে এই প্রযুক্তি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পথবিক্রেতা, এমনকী দিনমজুর পর্যন্ত আজ ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ। এআই সামিটে ম্যাক্রঁর বক্তব্য কেবল প্রশংসা নয়, বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতারও ইঙ্গিত বহন করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল পাবলিক গুডস এবং আন্তঃদেশীয় প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক আরও মজবুত হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ভারতের ডিজিটাল পরিচয় ও পেমেন্ট পরিকাঠামো এখন উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে এক মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরকে ‘স্কেলেবল ও রিপ্লিকেটেবল’ বলে উল্লেখ করেছে। ম্যাক্রঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধারাকেই আরও জোরালো করল।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগের ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যে বাস্তব রূপ পেয়েছে, তা আজ বিশ্বমঞ্চে আলোচিত। ইউপিআই -এর সাফল্য প্রমাণ করেছে প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনও বদলে দিতে পারে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘প্রযুক্তি তখনই অর্থবহ, যখন তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।’ ভারতের অভিজ্ঞতা সেই পরিবর্তনেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : লোক ভবনে বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি শেষে ইন্ডিয়া-ফ্রান্স ইনোভেশন ফোরামে রওনা মোদী-ম্যাক্রোঁ



