প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ঘর মানেই শুধু চার দেওয়াল আর আসবাব নয়। বিশ্বাস করা হয়, প্রতিটি ঘরের মধ্যেই প্রবাহিত হয় এক বিশেষ শক্তি, যা আমাদের মন, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। এই শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার প্রাচীন চীনা পদ্ধতিই হল ফেং শুই (Feng Shui), যাকে অনেকেই চাইনিজ জিওম্যানসি (Chinese Geomancy) নামে চেনেন।

ফেং শুইয়ের মূল দর্শন হল সঠিক প্রতীক, সঠিক স্থানে স্থাপন করলে জীবন হয়ে উঠতে পারে আরও শান্ত, সমৃদ্ধ ও ইতিবাচক। আজকাল ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেও ফেং শুই মূর্তির ব্যবহার কেবল বিশ্বাস নয়, তা এক ধরনের নান্দনিক স্টাইল স্টেটমেন্টে পরিণত হয়েছে। তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই মূর্তিগুলির রয়েছে গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। সঠিক মূর্তি, সঠিক দিকে রাখলে তা নাকি সৌভাগ্য ডেকে আনে, নেতিবাচক শক্তি দূরে রাখে এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে উন্নতির পথ প্রশস্ত করে। সেই ভাবনা থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ ফেং শুই মূর্তি, যা আপনার ঘর বা অফিসের সাজসজ্জার অংশ হওয়া উচিত।
ফেং শুই ড্রাগন মূর্তি (Feng Shui Dragon Statue) শক্তি ও সুরক্ষার এক শক্তিশালী প্রতীক। ড্রাগনকে ফেং শুইতে পুরুষালি ‘ইয়াং’ শক্তির প্রতিনিধি বলা হয়, যা নেতিবাচক প্রভাব দমন করে। স্বর্গীয়, জলাভূমি ও সমুদ্র— এই তিন ধরনের ড্রাগনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঘরের পূর্ব দিকে ড্রাগন মূর্তি রাখলে তা উন্নতি, জ্ঞান ও সাফল্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। হাসিখুশি মুখের লাফিং বুদ্ধ (Laughing Buddha) মূর্তি সুখ ও প্রাচুর্যের প্রতীক। পরিবারের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমাতে এই মূর্তির ভূমিকা নাকি অনস্বীকার্য। বিশ্বাস করা হয়, লাফিং বুদ্ধের দিকে তাকালেই মন হালকা হয়ে যায় এবং ঘরে আনন্দের আবহ তৈরি হয়।

আর্থিক উন্নতির কথা বললে ফেং শুই চার্জিং ষাঁড় (Charging Bull Statue) অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওয়াল স্ট্রিট বুল নামেও পরিচিত এই প্রতীক শক্তি, গতি ও দৃঢ়তার বার্তা দেয়। অফিসের ডেস্কে বা কর্মক্ষেত্রে এই মূর্তি রাখলে তা নাকি আর্থিক সাহস ও সুযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। সম্পদ ও শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত অ্যারোওয়ানা মাছ (Arowana Fish Statue)। বিশেষ করে সোনালি অ্যারোওয়ানা মাছের মুখে চীনা মুদ্রা থাকলে তাকে শুভ বলে ধরা হয়। পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব দিকে এই মূর্তি রাখলে অর্থাগম ও সমৃদ্ধির পথ খুলে যায়, এমনটাই বিশ্বাস। ফেং শুইয়ের আরেক শক্তিশালী রক্ষাকবচ হল সাদা বাঘ (White Tiger Statue)। সবুজ ড্রাগনের বিপরীতে অবস্থান করা এই বাঘ ‘ইয়িন’ শক্তির প্রতীক। ঘরের ডান দিকে বা পশ্চিম অভিমুখে সাদা বাঘ রাখলে তা ঘরকে নেতিবাচক শক্তি থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হয়।
দাম্পত্য সুখের প্রতীক ম্যান্ডারিন হাঁস (Mandarin Ducks Statue)। একজোড়া হাঁস প্রেম, বিশ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রতীক। দম্পতির শোবার ঘরে এই মূর্তি রাখলে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়, এমনটাই ফেং শুইয়ের ব্যাখ্যা। ড্রাগন কচ্ছপ (Dragon Turtle Statue) একটি অনন্য পৌরাণিক প্রতীক। ড্রাগনের মাথা ও কচ্ছপের দেহ,, এই মিলন সাফল্য, স্থায়িত্ব ও দীর্ঘায়ুর প্রতীক। মুখে চীনা মুদ্রা রেখে অফিস বা ঘরে রাখলে তা সৌভাগ্য ডেকে আনে বলে বিশ্বাস। আবার, তিন পা-ওয়ালা ব্যাঙ (Three-Legged Toad) ফেং শুইয়ে সম্পদের প্রতীক। সাধারণত দরজার দিকে মুখ করে নয়, বরং ঘরের ভিতরের দিকে মুখ করে এই মূর্তি রাখা হয়, যেন সম্পদ ঘরে প্রবেশ করে। ঘোড়া (Horse Statue) মানে গতি, স্বাধীনতা ও খ্যাতি। দক্ষিণ দিকে রাখলে খ্যাতি, উত্তর দিকে রাখলে কর্মজীবনের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
মানি ক্যাট বা টাকার বিড়াল (Maneki Neko / Money Cat) নতুন সুযোগ ও অর্থাগমের প্রতীক। অফিসের ক্যাশ কাউন্টার বা কাজের ডেস্কে এই মূর্তি রাখলে তা ব্যবসায় শুভ ফল আনে বলে মনে করা হয়। লাল ফিনিক্স (Red Phoenix Statue) রূপান্তর ও পুনর্জন্মের প্রতীক। দক্ষিণ দিকে রাখলে খ্যাতি ও স্বীকৃতির সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে, মোরগ (Rooster Statue) সৌভাগ্য ও সুরক্ষার প্রতীক। পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিকে রাখলে তা নেতিবাচক শক্তি দূর করে। হাতি (Elephant Statue) প্রজ্ঞা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। দক্ষিণ-পূর্ব বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রাখলে সম্পদ ও সৌভাগ্য বাড়ে বলে বিশ্বাস।
ফু ডগ বা ইম্পেরিয়াল গার্ডিয়ান লায়ন (Fu Dogs / Guardian Lions) প্রবেশপথে রাখলে ঘরকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে। গুয়ান গং (Guan Gong Statue), যিনি যুদ্ধের দেবতা হিসেবেও পরিচিত, আনুগত্য ও সাহসের প্রতীক। অফিসে রাখলে নেতৃত্ব ও সাফল্য বৃদ্ধি পায়। আবার পেঁচা (Owl Statue) জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক।

সামনের বারান্দা বা পড়ার ঘরে এই মূর্তি রাখলে মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ে। তবে ফেং শুই মূর্তি ব্যবহারে কিছু সতর্কতাও জরুরি। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া মূর্তি না রাখা, ভুল দিকে বা সরাসরি মাটিতে না রাখা, শোবার ঘর বা বাথরুমে মূর্তি এড়িয়ে চলা, এই নিয়মগুলি মানা প্রয়োজন। মূর্তিকে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং স্থাপনের আগে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, ফেং শুই কোনও যাদু নয়, এটি দর্শন। বিশ্বাস, সৌন্দর্য আর সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে আপনার ঘরের পরিবেশ বদলে দিতে পারে এই ছোট ছোট প্রতীকই।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Numerology 2026 Universal Year 1 | ২০২৬: নতুন চক্রের ডাক, সংখ্যাতত্ত্বে নেতৃত্ব, সাহস আর আত্মশক্তির বছর



