সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) একের পর এক নির্দেশে বুধবার- বৃহস্পতিবার উত্তাল হয়ে উঠল জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতি। এক দিকে এসআইআর মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর সওয়াল ঘিরে রাজনৈতিক চর্চা, অন্য দিকে ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা বা ডিএ মামলায় শীর্ষ আদালতের রায়। বৃহস্পতিবারের এই রায়েই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (West Bengal Government) উপর অবিলম্বে বড়সড় আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন একটাই, এই চাপ আসলে কতটা, আর ভোটের মুখে তার রাজনৈতিক অভিঘাতই বা কতখানি? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের পুরনো বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ এখনই মিটিয়ে দিতে হবে। এই নির্দেশের পরেই প্রশাসনিক মহলে হিসাব কষা শুরু হয়। প্রাথমিক যে অঙ্ক সামনে এসেছে, তাতে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মেটাতে রাজ্য সরকারের খরচ হবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার কিছু কম। অর্থাৎ, মোট বকেয়া ডিএ -এর পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের আর্থিক কাঠামোয় এই অঙ্ক যে যথেষ্ট ভারী, তা মানছেন প্রায় সকলেই।
তুলনামূলক হিসাবেই বিষয়টি আরও খোলসা। শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, শুধু ২৫ শতাংশ ডিএ মেটাতেই কৃষিখাতে এক বছরের বরাদ্দের থেকেও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে নবান্নকে। আবার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে (Lakshmir Bhandar Scheme) রাজ্য সরকারের খরচ হয়েছিল ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। সেই হিসেবে পুরো বকেয়া ডিএ মেটাতে গেলে লক্ষ্মীর ভান্ডারের দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে। এই অঙ্ক সামনে আসতেই বিরোধীরা রায়টিকে ‘আর্থিক ধাক্কা’ হিসাবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে স্লোগান তোলেন, ‘হারিল রে হারিল, মমতা হারিল’। বিজেপির (BJP) একাধিক নেতা দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় রাজ্য সরকারের আর্থিক ব্যর্থতার প্রমাণ। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে ডিএ বকেয়া রেখে রাজ্য কর্মচারীদের সঙ্গে বঞ্চনা করা হয়েছে, আর এখন আদালতের চাপে পড়েই টাকা মেটাতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। তবে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর অন্দরমহলে ছবিটা এতটা সরল নয়। দলের একজন আইনজীবী নেতার ব্যাখ্যা, এই রায়কে পুরোপুরি ‘ধাক্কা’ বলা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, হাই কোর্টের (Calcutta High Court) আগের নির্দেশ ছিল রাজ্য সরকারের জন্য অনেক বেশি কঠিন। সেই নির্দেশে বলা হয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে ১০০ শতাংশ বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট আপাতত ২৫ শতাংশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ, বাকি ৭৫ শতাংশ নিয়ে আলোচনার এবং সময় নেওয়ার সুযোগ থেকে গিয়েছে। তৃণমূলের মতে, এই জায়গাতেই রাজ্য কিছুটা ‘স্বস্তি’ পেয়েছে। শীর্ষ আদালতের রায়ে আরও বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের বকেয়া ডিএ -এর ২৫ শতাংশ এখনই দিতে হবে। বাকি ৭৫ শতাংশ কীভাবে, কত কিস্তিতে মেটানো হবে, তা খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে। রাজনৈতিক ভাবে তৃণমূল মনে করছে, এই কমিটি গঠনের মধ্য দিয়েই সময় পাওয়া গেল, যা রাজ্য সরকারের কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। শাসকদলের একজন প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘নবান্ন চেয়েছিল বিষয়টা যেন এক ধাক্কায় না আসে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন আমরা আর্থিক পরিকল্পনা করে এগোতে পারব।’ এই যুক্তিতে তৃণমূলের বক্তব্য, ভোটের আগে হঠাৎ করে পুরো বকেয়া মেটানোর চাপ তৈরি হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন হতো।

এই আবহেই বৃহস্পতিবার বিধানসভায় অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya)। সেখানে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত ৪ শতাংশ মহার্ঘভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়। যদিও সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই নতুন ডিএ বৃদ্ধির সঙ্গে পুরনো বকেয়া ডিএ মামলার কোনও সরাসরি যোগ নেই। তবু এই ঘোষণার ফলে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ-র সঙ্গে রাজ্যের ফারাক দাঁড়াল ৩৬ শতাংশে, যা আবার নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।রাজনৈতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ডিএ মামলার রায় যতটা আর্থিক, ততটাই রাজনৈতিক। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়ালকে তৃণমূল রাজনৈতিক সাফল্য হিসাবে তুলে ধরেছিল। তার ঠিক পরের দিনই ডিএ মামলায় এই রায় বিরোধীদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তবে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ভিন্ন। শাসকদলের এক নেতা সাফ বলেন, ‘এসআইআর নিয়ে মমতার সওয়াল যে অভিঘাত তৈরি করেছে, ডিএ মামলার রায় তার দশ শতাংশও ঢাকতে পারবে না।’
তাঁদের যুক্তি, ডিএ বকেয়া মূলত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের একটি নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত। সার্বিক ভোটের রাজনীতিতে এর প্রভাব সীমিত থাকবে। এমনকী তৃণমূলের প্রথম সারির একজন নেতা মন্তব্য করেন, ‘পোস্টাল ব্যালটে এমনিও আমরা অনেক জায়গায় হারি। তা দিয়ে সার্বিক ভোটের ফল এদিক-ওদিক হয় না।’ এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, শাসকদল ডিএ রায়কে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ। উল্লেখ্য যে, সুপ্রিম কোর্টের ডিএ রায় মমতা সরকারের সামনে এক কঠিন আর্থিক বাস্তবতা তুলে ধরলেও, তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। ভোটের মুখে এই ‘চাপ’ শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee SIR case | সামান্য বানান ভুলে ভোটাধিকার খর্ব নয়! মমতার সওয়ালের পর এসআইআর মামলায় নির্বাচন কমিশনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের




