সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দিল্লি পুলিশের (Delhi Police) অভিজাত স্পেশাল সেল সোয়াট শাখার (SWAT Special Cell) একজন কমান্ডোর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তোলপাড় গোটা দেশ। নিজের বাড়িতেই খুন হতে হল দিল্লি পুলিশের সোয়াট কমান্ডো কাজল চৌধুরিকে (Kajal Chaudhary)। অভিযোগ, স্ত্রীকে ডাম্বল দিয়ে মারধর করে খুন করেছেন তাঁর স্বামী অঙ্কুর চৌধুরি (Ankur Chaudhary)। শুধু তাই নয়, হত্যার পর কাজলের ভাই নিখিল চৌধুরিকে (Nikhil Chaudhary) ফোন করে অভিযুক্ত জামাইবাবু যে মন্তব্য করেন, তা শুনে রীতিমতো শিউরে উঠছে সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ প্রশাসনও। ফোনে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে এসে দিদির লাশ নিয়ে যা। পারলে আমার কথা রেকর্ড করে রাখিস।’
ঘটনার পরই দিল্লি পুলিশের তরফে দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়। অভিযুক্ত অঙ্কুর চৌধুরিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, দীর্ঘদিন ধরেই দাম্পত্য কলহ, পণ-সংক্রান্ত চাপ এবং শারীরিক-মানসিক অত্যাচারের অভিযোগ ছিল এই দম্পতির সম্পর্কে। কাজলের মৃত্যুকে ঘিরে ফের এক বার প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তারক্ষক হয়েও কী একজন মহিলা নিজের জীবন সুরক্ষিত রাখতে পারেন না? নিহত কাজলের ভাই নিখিল চৌধুরি জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে দিদির কাছ থেকে তিনি ফোন পান। ফোনে স্পষ্ট মারধরের শব্দ এবং দিদির আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন। নিখিলের কথায়, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ভয়ঙ্কর হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার আগেই ফোন কেটে যায়।’ এর কিছুক্ষণ পরেই অঙ্কুরের ফোন আসে নিখিলের মোবাইলে। ফোন ধরতেই শোনেন সেই ভয়াবহ স্বীকারোক্তি, ‘ওকে মেরে ফেলেছি, এসে লাশ নিয়ে যা।’

এই ফোন পাওয়ার পরই পরিবারের সদস্যরা ছুটে যান দিল্লির দ্বারকা মোড় এলাকার বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছেন কাজল। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ভারী ডাম্বল দিয়ে কাজলের মাথায় একাধিক আঘাত করা হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং গুরুতর আঘাতই মৃত্যুর কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, কাজল চৌধুরি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। ২০২২ সালে স্নাতক পাশ করার পরেই তিনি দিল্লি পুলিশে (Delhi Police Recruitment) চাকরি পান। নিজের যোগ্যতা ও শারীরিক সক্ষমতার জোরে দ্রুতই স্পেশাল সেল সোয়াট শাখায় কমান্ডো হিসেবে নির্বাচিত হন। পরিবার ও পরিচিতদের কাছে তিনি ছিলেন গর্বের। ২০২৩ সালে অঙ্কুর চৌধুরির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। শুরুতে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, বিয়ের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই পণের জন্য চাপ শুরু হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
নিখিলের দাবি, প্রথমে মানসিক অত্যাচার, পরে তা শারীরিক নির্যাতনে রূপ নেয়। একাধিক বার পারিবারিক স্তরে বিষয়টি মেটানোর চেষ্টা হয়। এমনকী পুলিশের মধ্যস্থতায় সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সাল থেকে আলাদা থাকতে শুরু করেন কাজল। তবুও অভিযোগ, আলাদা থাকলেও স্বামীর নির্যাতন থামেনি।তদন্তকারীদের অনুমান, ২২ জানুয়ারি রাতেই কাজলের উপর চূড়ান্ত হামলা চালানো হয়। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ২৭ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার সময় বাড়িতে আর কেউ উপস্থিত ছিল কি না, অথবা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই খুন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ মহলেও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একাধিক সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, কাজল ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সাহসী অফিসার। একজন সোয়াট কমান্ডোর এই মর্মান্তিক মৃত্যু সমাজে নারী নিরাপত্তা ও পণপ্রথার মতো কুপ্রথার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। নারী অধিকার সংগঠনগুলিও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। তাঁদের বক্তব্য, ‘যদি একজন প্রশিক্ষিত পুলিশ কমান্ডোও গৃহহিংসার হাত থেকে রেহাই না পান, তবে সাধারণ নারীদের অবস্থান কোথায়?’ অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তাঁরা সরব হয়েছেন।
অন্যদিকে, বর্তমানে অঙ্কুর চৌধুরিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাঁর মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড এবং পারিবারিক আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করা হবে।
কিন্তু, কাজলের মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, পোশাক, পদ বা ক্ষমতা নয়, সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনই নারীর প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Cooch Behar rape case | নাবালিকা নির্যাতনের অভিযোগে উত্তাল মেখলিগঞ্জ, আহত থানার ওসি, গ্রেফতার অভিযুক্ত-সহ ৮



