সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বারামতী : বারামতীতে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বুধবার সকালে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ার (Ajit Pawar)-সহ চার জনের মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজনীতি থেকে প্রশাসন সব মহলে। এই দুর্ঘটনায় যাঁদের প্রাণ গেল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুই অভিজ্ঞ পাইলটও। চার্টার্ড ‘বম্বার্ডিয়ার লিয়ারজেট ৪৫ (Bombardier Learjet 45) বিমানের ককপিটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত কপূর (Sumit Kapoor) এবং ফার্স্ট অফিসার শম্ভবী পাঠক (Shambhavi Pathak)। উপমুখ্যমন্ত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁদের কাঁধে।
বুধবার সকাল আনুমানিক ৮টা নাগাদ মুম্বই (Mumbai) থেকে বারামতীর (Baramati) উদ্দেশ্যে রওনা দেয় মাঝারি মাপের এই চার্টার্ড জেট বিমানটি। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ব্যস্ত সূচি ছিল অজিত পওয়ারের। অবিভক্ত এনসিপি-এর (NCP) শক্ত ঘাঁটি বারামতীতে সেদিন চারটি জনসভায় যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সকাল প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বারামতী বিমানবন্দরে অবতরণের সময় আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে রানওয়ের কাছেই আছড়ে পড়ে লিয়ারজেট ৪৫ বিমানটি। প্রবল শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরে যায় বিমানে। উদ্ধারকাজ শুরুর আগেই নিশ্চিত করা হয়, বিমানে থাকা সকলের মৃত্যু হয়েছে। সেই তালিকায় ছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ার, তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দু’জন যাত্রী এবং দুই পাইলট।
এই দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ককপিটে থাকা দুই পাইলট। ক্যাপ্টেন সুমিত কপূর ছিলেন এই উড়ানের পাইলট-ইন-কমান্ড। বিমান চালনার ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে। বিশেষ করে বিজ়নেস জেট এবং চার্টার্ড বিমানের উড়ান তাঁর দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার অংশ। ‘লিয়ারজেট ৪৫-এর মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেট বিমানের উড়ান, নেভিগেশন এবং অবতরণ সংক্রান্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাঁর উপরেই। সহকর্মীদের মতে, শান্ত স্বভাব ও পেশাদারিত্বের জন্য বিমানমহলে যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন সুমিত।
ককপিটে তাঁর পাশে ছিলেন ফার্স্ট অফিসার শম্ভবী পাঠক। তুলনামূলক ভাবে কম বয়সি হলেও তাঁর প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নজর কাড়ার মতো। শম্ভবীর লিঙ্কডইন (LinkedIn) প্রোফাইল থেকে জানা যায়, তিনি বায়ুসেনার স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তী কালে মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় (University of Mumbai) থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি ভর্তি হন নিউ জিল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কমার্শিয়াল পাইলট অ্যাকাডেমিতে (New Zealand International Commercial Pilot Academy)। সেখান থেকেই বাণিজ্যিক বিমান চালনার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে শম্ভবী যুক্ত ছিলেন ‘ভিএসআর ভেঞ্চার্স প্রাইভেট লিমিটেড’ (VSR Ventures Private Limited) -এর সঙ্গে। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এই সংস্থার হয়ে সহ-পাইলট হিসাবে কাজ করছিলেন তিনি। ২০২২ সালের অগস্ট মাসে সংস্থাটিতে ফার্স্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন শম্ভবী। লিয়ারজেট ৪৫-এর মতো আধুনিক বিমানে নিয়মিত উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। সহকর্মীদের বক্তব্য, দায়িত্বশীলতা ও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতেন।
দুর্ঘটনার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। আবহাওয়াজনিত কোনও সমস্যা ছিল কি না, যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছিল কি না, না কি অবতরণের সময়ে কোনও প্রযুক্তিগত বিভ্রাট ঘটে—তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA) এবং এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার হলে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে যেমন শোকের ছায়া, তেমনই বিমানচালক সমাজেও নেমে এসেছে গভীর বিষাদ। এক দিকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের আকস্মিক মৃত্যু, অন্য দিকে দুই প্রশিক্ষিত পাইলটের কর্মরত অবস্থায় প্রাণ হারানো, সমস্ত মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা বহু প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। বারামতীর আকাশে সেই সকাল শুধু একটি উড়ানের শেষ নয়, শেষ হয়ে গেল একাধিক স্বপ্ন, দায়িত্ব ও জীবনের পথচলা।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Indian AI Startups 2026, PM Narendra Modi AI Roundtable | ভারতের AI উদ্ভাবনে স্টার্টআপদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




