সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের (ICC T20 World Cup) আগে এমন নাটকীয় পরিস্থিতির কথা খুব কমই শোনা যায়। স্পনসর নেই, বিশ্বকাপের জন্য আলাদা জার্সিও নেই, এই অবস্থাতেই হঠাৎ করে বিশ্বমঞ্চে নামতে হচ্ছে স্কটল্যান্ডকে (Scotland)। বাংলাদেশের (Bangladesh) জায়গায় শেষ মুহূর্তে সুযোগ পেয়ে একদিকে যেমন উচ্ছ্বাস, তেমনই তীব্র অস্বস্তিতে ভুগছেন স্কটিশ ক্রিকেট কর্তারা। প্রস্তুতির অভাব, সময়ের সঙ্কট আর সাংগঠনিক চাপ, সব নিয়ে ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের (Cricket Scotland) অন্দরমহলে কার্যত ঘুম উড়েছে।
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ১৪ দিন আগে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসি (International Cricket Council- ICC)। আইসিসির চিফ এক্সিকিউটিভ সঞ্জয় গুপ্ত (Sanjay Gupta) নিজে ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গিয়েছে। বাংলাদেশের পরিবর্ত হিসাবে বিশ্বকাপে খেলতে আসার প্রস্তাব আসে আচমকাই। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি হল স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলবে, এমন কোনও পরিকল্পনাই আগে ছিল না। ফলে নেই প্রস্তুতি, নেই স্পনসর, এমনকি বিশ্বকাপের জন্য নির্দিষ্ট জার্সিও তৈরি করা হয়নি। বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড নতুন দল নয়। এই নিয়ে সপ্তম বারের জন্য বিশ্বকাপে খেলতে নামছে। তবু পরিস্থিতি এতটাই অপ্রত্যাশিত যে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বেড়েছে কর্তাদের উপর। ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের চিফ এগ্জ়িকিউটিভ ট্রুডি লিন্ডব্লেড (Trudy Lindblade) -এর কথাতেই সেই অস্বস্তি স্পষ্ট। তাঁর বক্তব্যে ধরা পড়েছে, কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে সব কিছু সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। লিন্ডব্লেড জানিয়েছেন, ‘এত কম সময়ের মধ্যে যদি বিশ্বকাপের জার্সি হাতে পাওয়া যায়, তা হলে সেটা আমাদের কাছে বাড়তি পাওনা হবে। না হলে সারা বছর যে জার্সি পরে খেলোয়াড়েরা খেলে, সেই জার্সিতেই বিশ্বকাপে নামতে হতে পারে। স্পনসর পাওয়া যাবে কী না, সেটাও নিশ্চিত নই। হাতে দিন সাতেক সময় আছে। এর মধ্যে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি।’ তাঁর এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে অংশগ্রহণ করলেও স্কটল্যান্ড কতটা সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যে কাজ করে।
শেষ মুহূর্তে এভাবে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়াটা যে গর্বের পাশাপাশি অস্বস্তিরও, সেটাও অকপটে স্বীকার করেছেন লিন্ডব্লেড। তাঁর কথায়, ‘আমরা কখনও এই ভাবে বিশ্বকাপ খেলতে চাইনি। বিশ্বকাপের একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জনের প্রক্রিয়া থাকে। কেউ হঠাৎ আমন্ত্রণ পেয়ে বিশ্বকাপ খেলতে চায় না। আমাদের এ বারের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির ফল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য আমাদের খারাপ লাগছে। বাংলাদেশ দলের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমবেদনা রয়েছে।’ উল্লেখ্য যে, স্কটল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই সীমাবদ্ধতার পেছনে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম রয়েছে। ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (England and Wales Cricket Board- ECB) সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর ১৯৯৪ সালে আইসিসির অ্যাসোসিয়েট সদস্য (Associate Member) হয় স্কটল্যান্ড। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের ক্রিকেট কাঠামো এখনও ছোট পরিসরের মধ্যেই রয়ে গিয়েছে। পুরো ক্রিকেট ব্যবস্থাটি প্রায় হাতেগোনা কয়েকজনের উপর নির্ভরশীল।
ক্রিকেট স্কটল্যান্ডে কোচ, উন্নয়ন আধিকারিক, প্রশাসনিক কর্মী, সব মিলিয়ে মোট সদস্য সংখ্যা ৩০ জনের সামান্য বেশি। লিন্ডব্লেড নিজেই জানিয়েছেন, ‘আমাদের সংগঠন খুব বড় নয়। কোচ, ক্রিকেট উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং সংস্থার কর্মী মিলিয়ে ৩০ জনের কিছু বেশি। এক সঙ্গে যদি দু’টি দল বিদেশ সফরে যায়, আমাদের উপর কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়।’ এই মুহূর্তে সেই চাপ আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। কারণ একই সঙ্গে তিনটি ফ্রন্ট সামলাতে হচ্ছে ক্রিকেট স্কটল্যান্ডকে। স্কটল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ দল (Scotland U-19) বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। মহিলা দল (Scotland Women’s Team) নেপাল সফরে রয়েছে এবং তারাও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের লড়াই চালাচ্ছে। এর মধ্যেই হঠাৎ যোগ হয়েছে পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। লিন্ডব্লেডের কথায়, ‘এখন আমাদের এক সঙ্গে তিনটি দলের দিকে নজর রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি খুবই চ্যালেঞ্জিং।’
কিন্তু এসব সমস্যার মধ্যেও আশাবাদী স্কটিশ কর্তারা। ক্রিকেটারদের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির উপর ভরসা রাখছেন তাঁরা। লিন্ডব্লেড বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জন্য খারাপ লাগলেও আমরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। আইসিসির ক্রমতালিকায় আমরা ১৪ নম্বরে রয়েছি। আমাদের দল যথেষ্ট শক্তিশালী। ক্রিকেটাররা সারা বছর খেলার মধ্যেই থাকে, তাই ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে আলাদা চিন্তা নেই।’ কিন্তু বিশ্বকাপ মানে শুধু মাঠের প্রস্তুতি নয়, রয়েছে বিপুল সাংগঠনিক কাজও। ভিসা, বিমানের টিকিট, থাকার ব্যবস্থা, এসব কিছুই করতে হবে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে। ক্রিকেট স্কটল্যান্ডের চিফ এগ্জ়িকিউটিভ জানাচ্ছেন, ‘অনেক কাজ বাকি। ক্রিকেটার ও কোচদের ভিসা করাতে হবে, সকলের বিমানের টিকিট কাটতে হবে। আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। হাতে সময় খুব কম। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সসস্ত চূড়ান্ত করতে হবে।’ উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জায়গায় হঠাৎ বিশ্বকাপে নামার সুযোগ স্কটল্যান্ডের জন্য যেমন স্বপ্নপূরণ, তেমনই এক কঠিন বাস্তব পরীক্ষাও। সীমিত পরিকাঠামো, অল্প সময় আর বিশাল প্রত্যাশার চাপ, এই তিনের মাঝে দাঁড়িয়ে স্কটিশ ক্রিকেট কতটা সফল হতে পারে, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Records 2026 | বিরাট কোহলি: ২০২৬ সালেই চারটি রেকর্ডের সামনে ভারতীয় ক্রিকেট মহাতারকা




