সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলায় অশান্তি ছড়ানোর যে কোনও চেষ্টা রুখতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ওয়াটগঞ্জের দইঘাটে নতুন শ্মশানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের পর প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ভোটের স্বার্থে কেউ যদি রাজ্যে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করতে চায়, তা কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ‘৩০ শতাংশ’ প্রসঙ্গ, যা ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।মমতা বলেন, ‘বাংলায় কেউ কেউ অশান্তি ছড়াতে চাইছেন। সতর্ক থাকতে হবে। ভোটের স্বার্থে কেউ কেউ গোলমাল পাকাতে চায়, কিন্তু বাংলা শান্তি চায়।’ প্রশাসনিক কর্তাদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ, সবাই যেন ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করেন এবং সাধারণ মানুষকে শান্তিতে রাখার দায়িত্ব নেন। তাঁর কথায়, ‘আমি তো ৩৬৫ দিন এখানে থাকি। আমাকে সব সামলাতে হয়। তাই শান্তি বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি।’
এই বক্তব্যের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী একটি বিশেষ মন্তব্য করেন, যা ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের ৩০ শতাংশ অন্য কোনও কমিউনিটির লোক হয়, আমরা ঝগড়া করলে রোজ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাবে। আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দেবে, টিকতে দেবে না।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, রাজ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ তফশিলি জাতি (Scheduled Caste) এবং প্রায় ৬ শতাংশ আদিবাসী (Tribal) জনগোষ্ঠী রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আদিবাসীদের উপর সামান্য কিছু ঘটলেই ট্রেন অবরোধের মতো ঘটনা ঘটে যায়। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, তিনি এমন পরিস্থিতি চান না। তাঁর কথায়, ‘আমি চাই সবাই সবার মতো শান্তিতে থাকুক। কেউ কারোর বিষয়ে নাক গলাবে না।’ মুখ্যমন্ত্রী যদিও সরাসরি কোনও সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করেননি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বাংলার জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১৪৬টিতে সংখ্যালঘু ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তথ্য অনুযায়ী, এই ১৪৬টি কেন্দ্রের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর দখলে রয়েছে ১৩১টি, বিজেপি (Bharatiya Janata Party) -এর দখলে ১৪টি এবং আইএসএফ (ISF) -এর হাতে রয়েছে একটি কেন্দ্র।
রাজনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, এমন ৭৪টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে যেখানে সংখ্যালঘু ভোটের হার ৪০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে। আবার ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে, এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ৭২টি। ফলে ভোটের অঙ্কে সংখ্যালঘু ভোট যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই মুখ্যমন্ত্রীর ‘৩০ শতাংশ’ মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। এই বক্তব্যের পর বিজেপির অন্দরেও সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি পদে শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের তরফে সংখ্যালঘু সমাজের উদ্দেশে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বারবার দাবি করেছেন, তিনি কখনও বলেননি যে মুসলিম ভোট চান না। তাঁর বক্তব্য, তিনি শুধু বলেছেন যে সংখ্যালঘুদের ভোট তিনি পান না। শুভেন্দুর দাবি, ‘খুনি বা দুষ্কৃতীদের কোনও জাত বা ধর্ম হয় না।’ তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাঁকে মুসলিম-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভোটের মুখে এই সংখ্যালঘু পাটিগণিত যে আরও জোরালো হবে, তা স্পষ্ট। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শাসক-বিরোধী তরজা শুরু হয়ে গিয়েছে। সিপিএম (CPI(M)) -এর রাজ্য নেতা কলতান দাশগুপ্ত (Kallatan Dasgupta) এই প্রসঙ্গে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘পুলিশ প্রশাসন যদি তৃণমূলকে দেখলে টেবিলের তলায় লুকিয়ে পড়ে, তাহলে কারা অশান্তি তৈরির চেষ্টা থামাবে? বিজেপি নেতারা যদি পাড়ায় পাড়ায় ধর্ম-জাতের রাজনীতি তৈরি করতে প্রস্তুত থাকে, আর তাতে তৃণমূল নেতারাও জড়িত থাকে, তা হলে কে কাকে থামাবে?’ তবে, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য এক দিকে যেমন প্রশাসনকে সতর্ক থাকার বার্তা দিল, তেমনই অন্য দিকে রাজ্যের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোট ও সামাজিক শান্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিল। ভোট যত এগোচ্ছে, ততই এই ‘শান্তি বনাম অশান্তি’ বিতর্ক যে আরও তীব্র হবে, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Republic Day Speech | ‘চিরন্তন সতর্কতাই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র’ : সাধারণতন্ত্র দিবসে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




