সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) -এর যে শুনানি চলছে, তাতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে প্রকৃত চিত্র। নির্বাচন কমিশনের সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া শুনানির ভিত্তিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে আপাতত বাদ পড়ছে ১১,৪৭২ জন ভোটারের নাম। কমিশনের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, এই ভোটারদের নথি যাচাই ও শুনানির পরে ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় আর থাকছে না। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
কমিশন সূত্রের দাবি, এখনও পর্যন্ত রাজ্যে মোট ৯,৩০,৯৯৩ জন ভোটারের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যেই যাচাই-বাছাই শেষে ১১,৪৭২ জনকে ‘অবৈধ’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও-রা (Electoral Registration Officer)। শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি, ঠিকানার প্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। কমিশনের এক কর্তা জানান, ‘নথিপত্র ও শুনানির ভিত্তিতে যাঁদের যোগ্যতা প্রমাণিত হয়নি, তাঁদের নামই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।’ এর আগে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়ই ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম খসড়া তালিকায় নেই। কমিশন তখনই জানিয়েছিল, ওই তালিকাভুক্তদের বড় অংশই ‘নো ম্যাপিং’ ক্যাটেগরির। অর্থাৎ তাঁদের ঠিকানা বা পরিচয়ের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। কমিশনের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, এই প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হবে। পাশাপাশি আরও লক্ষাধিক ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যাঁদের ক্ষেত্রেও তথ্য যাচাই অপরিহার্য বলে সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে রাজ্যে এসআইআরের শুনানি পর্ব শুরু হয়েছে। কমিশনের দাবি, ধাপে ধাপে এই শুনানি এগোচ্ছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৯ লক্ষেরও বেশি ভোটারের শুনানি হয়ে যাওয়ায় একটি প্রাথমিক ছবি সামনে এসেছে। সেই ছবি অনুযায়ী, ‘অবৈধ’ ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম হলেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে কমিশন। এক আধিকারিকের কথায়, ‘সংখ্যা কম হলেও ভোটার তালিকার বিশুদ্ধতার জন্য এই সংশোধন অত্যন্ত জরুরি।’ এছাড়াও, জেলা ভিত্তিক তথ্যেও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত শুনানিতে সবচেয়ে বেশি ‘অবৈধ’ ভোটার শনাক্ত হয়েছে নদিয়া জেলায়। সেখানে ৯,২২৮ জন ভোটারকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের মতে, সীমান্ত সংলগ্ন জেলা হওয়ায় নদিয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল। অন্য দিকে, এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া শুনানিতে দক্ষিণ কলকাতা এবং বাঁকুড়া জেলায় একজনও ‘অবৈধ’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হননি। এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট, জেলাভেদে পরিস্থিতির ফারাক রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের মোট ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একযোগে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত ৪ নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গে ১১ ডিসেম্বর এনুমারেশন বা গণনা পর্ব শেষ হয়। তার পর ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে আনা হয় খসড়া ভোটার তালিকা। সেই তালিকা ঘিরেই মূলত বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কমিশনের বক্তব্য ছিল, ‘খসড়া তালিকা চূড়ান্ত নয়। শুনানি ও যাচাইয়ের পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশনের সেই বক্তব্যই কার্যত বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।রাজনৈতিক মহলেও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্ট। শাসক ও বিরোধী শিবির, উভয় পক্ষই ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার পক্ষে সওয়াল করলেও, পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন দল। তবে কমিশনের তরফে বারবার জানানো হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া সংবিধান ও নির্বাচন সংক্রান্ত বিধি মেনেই চলছে। কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিকের মন্তব্য, ‘কোনও রাজনৈতিক চাপ নয়, কেবল নথি ও শুনানির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।’
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়ো বা অবৈধ ভোটারের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। তাই এসআইআর-এর মতো কঠোর প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয় হলেও, সাধারণ ভোটারদের হয়রানি যাতে না হয়, সে দিকেও নজর রাখা জরুরি। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও বহু ভোটারের শুনানি বাকি রয়েছে। ফলে আগামী দিনে ‘অবৈধ’ ভোটারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বা কমতেও পারে। প্রসঙ্গত, এসআইআরের শুনানি পর্ব রাজ্যের ভোটার তালিকা নিয়ে একটি বড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আপাতত ১১,৪৭২ জন ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে কমিশনের চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবু এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা যে আরও এক ধাপ এগোবে, সে বিষয়ে আশাবাদী প্রশাসনিক মহলের একাংশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Gyanesh Kumar letter, Mamata Banerjee SIR allegation | এসআইআর বিতর্কে চিঠি-রাজনীতি তুঙ্গে, মমতার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেই জ্ঞানেশ কুমারকে পাল্টা চিঠি শুভেন্দুর




