বিশেষ সংবাদদাতা, সাশ্রয় নিউজ ★ ঢাকা : বাংলাদেশে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও মানবিকতার প্রশ্নে চরম উদ্বেগ তৈরি করল মানিকগঞ্জের এক মর্মান্তিক ঘটনা। চিকিৎসার আশ্রয় নেওয়ার জায়গাতেই স্বামীকে আটকে রেখে এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ (Manikganj) জেনারেল হাসপাতালে এই ঘটনায় অভিযুক্ত দুই সহায়তাকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বাংলাদেশ জুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে অসুস্থ মানুষ ও তাঁদের পরিবার নিরাপত্তার আশায় যান, সেখানে কী ভাবে এমন নৃশংস অপরাধ সম্ভব?
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে খবর, রবিবার দুপুরে ওই মহিলা তাঁর স্বামীর সঙ্গে মামারবাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছন। ঠিক সেই সময় তাঁদের ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চার্জ শেষ হয়ে যায়। রাত আনুমানিক ১২টা নাগাদ উপায় না পেয়ে কাছের মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভ্যানটি চার্জ দেওয়ার আশায় আশ্রয় নেন তাঁরা। তখনই হাসপাতালের দুই সহায়তাকারী তাঁদের সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে হাসপাতালের ভিতরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, সহযোগিতার নাম করে ওই দম্পতিকে হাসপাতালের একটি নির্জন অংশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে আলাদা ঘরে আটকে রাখা হয়। সেই সুযোগে ওই মহিলা উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয় বলে অভিযোগ। নির্যাতিতা জানিয়েছেন, তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ভয় দেখিয়ে ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তিনি গুরুতর মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
বর্তমানে নির্যাতিতা মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক আঘাতও গভীর। পরিবারের তরফে ইতিমধ্যেই মানিকগঞ্জ সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অভিযুক্ত দুই সহায়তাকারীকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আরএমও (RMO) মহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম (Mohammad Touhidul Islam) জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের শনাক্ত করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাঁর কথায়, ‘হাসপাতালের ভিতরে এমন ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। আমরা পুলিশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছি।’ যদিও সাধারণ মানুষের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থাই সবচেয়ে জরুরি ছিল।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মহম্মদ ইকরাম হোসেন (Mohammad Ikram Hossain) জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলেই পুলিশ গ্রেফতারির পথে এগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের কোনও রকম রেয়াত করা হবে না।’ উল্লেখ্য, এই ঘটনা বাংলাদেশের হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। হাসপাতালে রাতের বেলায় নিরাপত্তার ঘাটতি, অস্থায়ী কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির অভাব, এই সব বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, হাসপাতাল এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় থাকে। সেখানে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে তা সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
নারী অধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ধর্ষণের মতো অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। হাসপাতালের মতো জায়গায় এমন অপরাধ প্রমাণ করে, নারী নিরাপত্তা এখনও কতটা ভঙ্গুর। তাঁরা দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। এই ঘটনার জেরে মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, শুধু অভিযুক্তদের শাস্তি দিলেই হবে না, হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগ, নজরদারি ও সিসিটিভি ব্যবস্থার মতো বিষয়েও সংস্কার প্রয়োজন। রাতের বেলায় হাসপাতাল চত্বরে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা জরুরি বলেও মত তাঁদের। প্রসঙ্গত, মানিকগঞ্জের এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধের খবর নয়, বরং সমাজ ও প্রশাসনের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। হাসপাতাল কি আদৌ নিরাপদ? আর কত দিন নারীরা নিরাপত্তার অভাবে আতঙ্কে দিন কাটাবেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই এখন তাকিয়ে গোটা বাংলাদেশ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Khaleda Zia Funeral: Jaishankar Hands Over India’s Condolence to Tarique Rahman | খালেদা জিয়ার শেষযাত্রায় মানুষের ঢল, ঢাকায় তারেক রহমানের হাতে ভারতের শোকবার্তা




