তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : একটা সময় সমাজে ধারণা ছিল, নারীজীবনের স্বাভাবিক পরিণতি মানেই মাতৃত্ব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা যে আমূল বদলাচ্ছে, তা সাম্প্রতিক গবেষণাগুলির দিকে তাকালেই স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠছে, মহিলাদের মধ্যে কি সত্যিই সন্তান লাভের চাহিদা কমছে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা যে তথ্য সামনে আনছেন, তা অনেককেই চমকে দিচ্ছে। সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো একাধিক বিষয়ের প্রভাব মিলেমিশে আজ মাতৃত্বের সিদ্ধান্তকে একেবারে নতুন আলোয় এনে দাঁড় করিয়েছে।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমীক্ষা বলছে, আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা এখন ইচ্ছাকৃত ভাবে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই প্রবণতা শুধু উন্নত দেশেই নয়, ভারত (India) -সহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনও ‘হঠাৎ সিদ্ধান্ত’ নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া সামাজিক ও ব্যক্তিগত বাস্তবতার ফল। এক জন গবেষকের কথায়, ‘মাতৃত্ব আজ আর সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি সচেতন পছন্দ।’ শিক্ষার প্রসার এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত মহিলারা আগের প্রজন্মের তুলনায় নিজেদের শরীর, ভবিষ্যৎ ও অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা জানেন, সন্তান নেওয়া শুধু আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শারীরিক ঝুঁকি, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘ সময়ের মানসিক দায়িত্ব। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ‘আমি কি সত্যিই এখন সন্তান নেওয়ার জন্য প্রস্তুত?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেক সময় সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হচ্ছে একেবারেই সন্তান না নেওয়ার।
কর্মজীবনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে মহিলারা নেতৃত্বের আসনেও বসছেন। কর্পোরেট দুনিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান বা সৃজনশীল ক্ষেত্র, প্রায় সব জায়গাতেই তাঁদের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সন্তান নেওয়া মানেই অনেক সময় কেরিয়ারে ছেদ। যদিও অনেক সংস্থা এখন মাতৃত্বকালীন ছুটি বা ফ্লেক্সিবল কাজের সুযোগ দিচ্ছে, তবু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ‘মা হওয়া মানেই কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়া’ এই আশঙ্কা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে অনেক মহিলা মনে করছেন, ‘নিজের পরিচয় গড়ে তোলাই এখন অগ্রাধিকার।’ তবে, অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। শহুরে জীবনে সন্তানের লালন-পালনের খরচ ক্রমশ বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অতিরিক্ত কার্যকলাপ প্রভৃতি মিলিয়ে একটি শিশুকে বড় করতে যে ব্যয়, তা অনেক দম্পতির কাছেই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একজন অর্থনীতিবিদের মতে, ‘সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখন আবেগের পাশাপাশি একটি আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়।’ এই বাস্তবতায় অনেক মহিলা এবং দম্পতি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন বা পুরোপুরি বাদ দিচ্ছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটিও ক্রমশ আলোচনার কেন্দ্রে আসছে। আগের প্রজন্মে মাতৃত্বের ক্লান্তি, হতাশা বা প্রসবোত্তর অবসাদ (Postpartum Depression) নিয়ে খুব বেশি কথা হত না। এখন সেই বিষয়গুলি খোলাখুলি আলোচনায় আসছে। অনেক মহিলা স্পষ্ট বলছেন, ‘নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যারা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ এই মানসিক চাপ ও দায়িত্বের দিকটি গভীরভাবে বিবেচনা করছেন। সম্পর্কের ধরন বদলানোও এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। বিয়ে (Marriage) এবং পরিবার (Family) -এর ধারণা আগের মতো স্থির নেই। অনেকেই বিয়ে করছেন দেরিতে, আবার কেউ কেউ বিয়ে না করেই একত্রবাসে (Live-in Relationship) থাকছেন। এই পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তও স্বাভাবিক ভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, ‘যেখানে সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে, সেখানে মাতৃত্বের সিদ্ধান্তও বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক।’ তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্ট করছেন, সন্তান নেওয়ার চাহিদা কমছে মানেই মাতৃত্বের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে, এমনটা নয়। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, মাতৃত্ব এখন আরও সচেতন, পরিকল্পিত এবং ইচ্ছানির্ভর হয়ে উঠছে। অনেক মহিলা দেরিতে হলেও সন্তান নিচ্ছেন, যাতে তাঁরা শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকেন। কেউ কেউ আবার একটি সন্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন। অর্থাৎ, সংখ্যার পরিবর্তন হলেও অনুভূতির গভীরতায় কোনও ঘাটতি নেই।এই পরিবর্তনের সামাজিক প্রভাবও কম নয়। জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার (Population Growth Rate) কমে আসা, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর গঠন বদলানো, এসব বিষয় নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে। এক জন নীতি বিশ্লেষকের কথায়, ‘মহিলাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো যেমন জরুরি, তেমনই ভবিষ্যতের জনসংখ্যা কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে।’ তাই অনেক দেশ পরিবারবান্ধব নীতি, চাইল্ড কেয়ার সাপোর্ট এবং কর্মক্ষেত্রে সমতার দিকে জোর দিচ্ছে। মনে রাখার বিষয়, গবেষণার এই তথ্য সমাজের সামনে এক নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, মাতৃত্ব কী বাধ্যবাধকতা, না একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ? উত্তর স্পষ্ট না হলেও একটি বিষয় নিশ্চিত, মহিলারা এখন নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন। সন্তান নেওয়া হোক বা না হোক, সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে এখন রয়েছেন তাঁরাই।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Medical Termination of Pregnancy Act, Supreme Court of India | ‘গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে নারীকে বাধ্য করা তাঁর দেহগত স্বাধিকারের লঙ্ঘন’ : দিল্লি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়




