শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : বলিউডে যাঁর নামের সঙ্গে নাচ, অ্যাকশন ও নিখুঁত শরীরী ভঙ্গির ছবি এক সূত্রে গাঁথা, তিনি হৃতিক রোশন (Hrithik Roshan)। এই প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতাইই নন, এক আবেগের নাম। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ লড়াই, যন্ত্রণার ইতিহাস এবং চিকিৎসকদের দেওয়া কঠিন সতর্কবার্তা। একটা সময় এমনও বলা হয়েছিল, হৃতিক কোনও দিনই নায়কসুলভ শরীর গড়ে তুলতে পারবেন না, তা-ই নয়, নাচ বা অ্যাকশন ছবিতে অভিনয় করাও তাঁর পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। হৃতিকের জীবনের এই দুর্যোগ শুরু হয়েছিল মাত্র ২১ বছর বয়সে। তখনই তাঁর শরীরে ধরা পড়ে মেরুদণ্ডের একটি জটিল সমস্যা। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে বলা হয় স্কোলিওসিস (Scoliosis)। এই রোগের ফলে মেরুদণ্ড স্বাভাবিকের তুলনায় বেঁকে যায়। এই সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক কসরত, ভারী ব্যায়াম বা টানা নাচ তাঁর পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। সেই সঙ্গে ছিল স্পষ্ট সাবধানবাণীও, নাচ কিংবা অ্যাকশন ছবির কথা ভুলে যাওয়াই ভাল।
এই খবর যে কোনও তরুণের স্বপ্ন ভেঙে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু হৃতিক রোশন সেই সময় ভেঙে পড়েননি। নিজের সীমাবদ্ধতাকেই তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। বাবার ছবি ‘কহো না প্যায়ার হ্যায়’ মুক্তি পাওয়ার আগেই তাঁকে শুনতে হয়েছিল এই কঠিন সত্য। নায়ক হওয়ার স্বপ্ন তখনও তাঁর চোখে, অথচ শরীর সায় দিচ্ছে না, এই দ্বন্দ্বই তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে। হৃতিক নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের কথায় তিনি দমে যাননি। তাঁর কথায়, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, আমার শরীর নাচ বা অ্যাকশন ছবির জন্য উপযুক্ত নয়। আমি সেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’ এই মানসিকতার ফলেই ধীরে ধীরে নিজের তিনি শরীরকে নতুন করে গড়ে তোলার পথে হাঁটেন।
কিন্তু, শুরুর দিকে ভারী ওজন তোলার প্রশ্নই উঠত না। তাই বই হাতে নিয়ে শুরু করেছিলেন ব্যায়াম। ধীরে ধীরে সেই বইয়ের জায়গা নেয় হালকা ডাম্বল। প্রতিটি ধাপেই ছিল সতর্কতা। কোনও ভাবেই যেন মেরুদণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে দিকেই নজর ছিল। বছরের পর বছর ধরে এই অনুশীলন চলতে থাকে। পাশাপাশি নাচের মহড়াও চলেছে ধীরে, পরিকল্পিত ভাবে। প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল হিসেব করে, শরীরের সীমা বুঝে। এই কঠোর পরিশ্রমের ফল খুব দ্রুতই দেখতে পান দর্শকরা। ‘কহো না প্যায়ার হ্যায়’ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই হৃতিক রোশন রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিনয়ের পাশাপাশি নাচ দর্শকের মন জয় করে নেয়। ‘এক পল কা জিনা’ কিংবা ‘ম্যায় আইসা কিঁউ হু’ এই গানগুলিতে তাঁর নাচ তখন ভাইরাল শব্দটির প্রচলন না থাকলেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়। ভারতীয় দর্শক মুগ্ধ হয়ে দেখেছে, কী ভাবে তাঁর পায়ের জাদু পর্দা দখল করে নিচ্ছে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক অ্যাকশন ছবি করেছেন হৃতিক। ‘লক্ষ্য’, ‘ধূম ২’, ‘কৃশ’, ‘ওয়ার’ প্রভৃতি প্রতিটি ছবিতেই তাঁর শারীরিক ফিটনেস ও নাচের দক্ষতা প্রশংসিত হয়েছে। অথচ এই সব ছবির পেছনে রয়েছে ব্যথা, থেরাপি এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ। কারণ, মেরুদণ্ডের সমস্যা পুরোপুরি সেরে যায়নি। কিন্তু সেই সমস্যা নিয়েই এগোতে হয়েছে।
ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, হৃতিকের এটি মানসিক দৃঢ়তার উজ্জ্বল উদাহরণ। যেখানে অনেকেই সামান্য বাধায় থেমে যান, সেখানে হৃতিক নিজের দুর্বলতাকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা সাফল্যের পথে অন্তরায় হতে পারে, কিন্তু মানসিক শক্তি থাকলে সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। এখনও হৃতিক রোশন নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তবে তা চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে। তাঁর নাচে এখনও সেই আগুন, অ্যাকশনে সেই তেজ। তবে তিনি কখনওই নিজের শরীরের সঙ্গে আপস করেন না। প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেন, থেরাপি চালিয়ে যান। এই সচেতনতা তাঁকে দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে টিকিয়ে রেখেছে।হৃতিকের এই লড়াই প্রজন্মের কাছে বিশেষ বার্তা। সাফল্য শুধু প্রতিভার উপর নির্ভর করে না, প্রয়োজন ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নিজের উপর বিশ্বাস।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Hrithik Roshan Yami Gautam Koffee With Karan | ‘সহঅভিনেত্রীর সম্মান আগে’ : কফি উইথ করণে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে ফের আলোচনায় হৃতিক রোশন




