সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতীয় খেলাধূলায় পরিকাঠামোকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞাননির্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল ভারতীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ (স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা Sports Authority of India, SAI)। নতুন দিল্লিতে (New Delhi) অবস্থিত সাই-এর স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগে কমব্যাট স্পোর্টস কোচদের জন্য শুরু হয়েছে চার দিনের বিশেষ স্পোর্টস সায়েন্স কর্মশালা। এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য হল দৈনন্দিন কোচিং প্রক্রিয়ায় বৈজ্ঞানিক নীতি ও আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে ভারতীয় অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক স্তরে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। এই কর্মশালায় অংশ নিচ্ছেন সাই-এর অধীনস্থ বিভিন্ন কমব্যাট স্পোর্টস বিভাগের কোচরা। এর মধ্যে বক্সিং (Boxing), কুস্তি (Wrestling) ও জুডো (Judo) -এর মতো জনপ্রিয় ও পদকসম্ভাবনাময় খেলাগুলির প্রশিক্ষকরাই মূলত রয়েছেন। আয়োজকদের বক্তব্য, যুদ্ধক্রীড়া এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে শক্তি, গতি, সহনশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে কোচদের হাতে যদি বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির শক্ত ভিত্তি থাকে, তবে তা সরাসরি অ্যাথলিটদের উন্নত পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হবে।
এই চার দিনের কর্মশালাটি পরিকল্পিত হয়েছে একটি গভীর ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী হিসেবে। এখানে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাউ নয়, কীভাবে প্রশিক্ষণের সময় বৈজ্ঞানিক নীতিগুলি মাঠে প্রয়োগ করা যায়, তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কমব্যাট স্পোর্টসের উপযোগী ‘স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং’ (Strength and Conditioning) মডেলের উপর আলোকপাত করা হচ্ছে। কোচদের শেখানো হচ্ছে ফাংশনাল স্ট্রেংথ ট্রেনিং, প্লায়োমেট্রিক্স, পিরিয়ডাইজড রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং প্রোগ্রাম এবং পারফরম্যান্সভিত্তিক এক্সারসাইজ ফিজিওলজির মৌলিক ধারণা। উল্লেখ্য, সাই-এর স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের ডিরেক্টর ও প্রধান ব্রিগেডিয়ার (ডা.) বিভু কল্যাণ নায়ক (Brigadier Dr. Bibhu Kalyan Nayak) কর্মশালার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘মাননীয় কেন্দ্রীয় যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রী ডা. মনসুখ মান্ডবিয়া (Dr. Mansukh Mandaviya) এবং ক্রীড়া সচিব ধারাবাহিক ভাবে জোর দিয়ে আসছেন যে কোচদের মধ্যে স্পোর্টস সায়েন্সের জ্ঞান আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে তা দৈনন্দিন প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করা যায়।’ তাঁর মতে, কোচ এবং স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের মধ্যে এই ধরনের নিবিড় সহযোগিতা ভারতের পদক সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভিশন হল অ্যাথলিট-কেন্দ্রিক, কোচ-নেতৃত্বাধীন এবং স্পোর্টস সায়েন্স দ্বারা সমর্থিত একটি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে সাই এখন আর কেবল পরিকাঠামো বা প্রতিভা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈজ্ঞানিক সহায়তাকে খেলাধুলির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর।
কর্মশালায় যুদ্ধক্রীড়া বা কমব্যাট স্পোর্টস সংক্রান্ত সাধারণ চোট, বিশেষ করে কাঁধের সমস্যার প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধক্রীড়ায় কাঁধের উপর অত্যধিক চাপ পড়ে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি চোটের আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যার মোকাবিলায় প্রমাণভিত্তিক ওয়ার্ম-আপ প্রোটোকল, স্ট্রেংথ ও স্ট্যাবিলিটি ট্রেনিং এবং বৈজ্ঞানিক লোড ম্যানেজমেন্ট কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্পোর্টস নিউট্রিশন, রিকভারি সায়েন্স, ডোপিং-বিরোধী সচেতনতা এবং ব্যবহারিক স্পোর্টস সাইকোলজির উপর আলাদা মডিউল রাখা হয়েছে, যাতে অ্যাথলিটদের স্থায়ী পারফরম্যান্স ও কেরিয়ারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়। কর্মশালার উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন বর্ধমান মহাবীর মেডিক্যাল কলেজ ও সফদরজং হাসপাতাল (Vardhman Mahavir Medical College and Safdarjung Hospital), নতুন দিল্লির স্পোর্টস ইনজুরি সেন্টার (Sports Injury Centre বা SIC) -এর ডিরেক্টর অধ্যাপক (ডা.) দীপক জোশী (Prof. Dr. Deepak Joshi)। তিনি বলেন, ‘স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস মেডিসিন এবং ইনজুরি ম্যানেজমেন্টের সমন্বিত প্রয়োগ একজন অ্যাথলিটের কেরিয়ারের দিশাই বদলে দিতে পারে।’ তাঁর মতে, আধুনিক খেলাধূলাতে শুধুমাত্র প্রতিভা যথেষ্ট নয়, সঠিক চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক পুনর্বাসন সমান ভাবে জরুরি। এই সহযোগিতাকে আরও মজবুত করতে সাই এবং সফদরজং হাসপাতালের স্পোর্টস ইনজুরি সেন্টারের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। মাননীয় যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রীর নীতিগত অনুমোদনের পর এই চুক্তি কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, উন্নত স্পোর্টস মেডিসিন ও সার্জিক্যাল হস্তক্ষেপের দায়িত্ব নেবে এসআইসি, আর সাই পরিচালনা করবে ব্যবহারিক স্পোর্টস সায়েন্স পুনর্বাসন এবং ‘রিটার্ন-টু-প্লে’ প্রোটোকল। এর ফলে সাই-এর দ্বারা রেফার করা ভারতীয় অ্যাথলিটরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা ও ধারাবাহিক ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার সুবিধা পাবেন। ক্রীড়াবিদদের মতে, এই উদ্যোগ ভারতীয় ক্রীড়া ব্যবস্থার জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ এতে একদিকে যেমন কোচদের দক্ষতা বাড়বে, অন্যদিকে অ্যাথলিটরা পাবে দ্রুত ও নিরাপদভাবে প্রতিযোগিতায় ফেরার সুযোগ। সব মিলিয়ে, যুদ্ধক্রীড়া বা কমব্যাট স্পোর্টস থেকে শুরু করে সামগ্রিক ভারতীয় খেলাধুলিকে বিজ্ঞানসম্মত পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই কর্মশালা ও সহযোগিতা এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian AI Startups 2026, PM Narendra Modi AI Roundtable | ভারতের AI উদ্ভাবনে স্টার্টআপদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




