সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বাঁকুড়া : বাঁকুড়া জেলার (Bankura District) শ্যামপুর গ্রামে (Shyampur Village) নেমে এল আতঙ্ক আর শোকের অন্ধকার। নিজের জন্মদাতা বাবার হাতেই প্রাণ হারাতে হল একজন তরুণীকে। বাড়ির একটি ঘর খালি করানো নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত রূপ নিল নৃশংস খুনে। ২২ বছরের ভবানী মাল (Bhabani Mal) -এর রহস্যজনক নিখোঁজের পর ১৩ দিন কেটে গেলে পরিত্যক্ত কুয়ো থেকে উদ্ধার হল তাঁর পচাগলা দেহ। তদন্তে নেমে পুলিশ যে তথ্য সামনে এনেছে, তা শুনে স্তম্ভিত গোটা এলাকা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবানীর বিয়ে হয়েছিল বিকনা গ্রামে (Bikna Village) বছর দু’য়েক আগে। কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বিয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। সেই থেকেই শুরু অশান্তির বীজ। ভবানীর বাবা ঈশান মাল (Ishan Mal) এবং সৎমায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে উঠেছিল।
পরিবারের দুই কামরার একটিতে একাই থাকতেন ভবানী। অন্য ঘরে থাকতেন বাবা, সৎমা এবং চার ভাইবোন। অভিযোগ ছিল, ভবানী ‘একাই ঘর দখল করে রেখেছেন’। এই বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার ঝগড়াও হয়। যদিও প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, ভবানী কারও উপর নির্ভরশীল ছিলেন না। সংসারের খরচ জোগাতে তিনি বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতেন। তবু ঘর ছাড়তে হবে এই দাবিতে অনড় ছিলেন তাঁর বাবা। ১৪ ডিসেম্বরের পর থেকে ভবানীকে আর এলাকায় দেখা যায়নি। দিন কেটে গেলেও মেয়ের কোনও খোঁজ না পেয়ে ২৭ ডিসেম্বর বাঁকুড়া সদর থানায় (Bankura Sadar Police Station) নিখোঁজ ডায়েরি করেন বাবা ঈশান মাল নিজেই। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, রহস্য ততই ঘনীভূত হতে থাকে। ৩১ ডিসেম্বর ওন্দা থানার (Onda Police Station) দিগশুলির জঙ্গল (Digshuli Forest) এলাকায় কাঠ কুড়োতে গিয়ে কয়েক জন স্থানীয় বাসিন্দা তীব্র পচা গন্ধ পান। সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা এগিয়ে যান জঙ্গলের ভিতরে থাকা একটি পরিত্যক্ত কুয়োর দিকে। কুয়োর জলে বস্তাবন্দী কিছু ভাসতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে বস্তা উদ্ধার করে খুলতেই বেরিয়ে আসে একজন যুবতীর পচাগলা দেহ। পরে শনাক্তকরণে নিশ্চিত হয়, দেহটি নিখোঁজ ভবানী মালেরই।
দেহ উদ্ধারের পর তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়েন ঈশান মাল। তিনি স্বীকার করেন, খুন তিনিই করেছেন। পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, মেয়েকে বারবার ঘর ছেড়ে দিতে বললেও সে রাজি হয়নি। সেই রাগ আর ক্ষোভ থেকেই তিনি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশ সূত্রে আরও উল্লেখ, এক রাতে ইট দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয় ভবানীকে। পরে দেহ বস্তাবন্দী করে তার মধ্যে ইট-পাথর ভরে জঙ্গলের কুয়োয় ফেলে দেওয়া হয়, যাতে দেহ জলে ডুবে থাকে এবং কোনও দিন প্রকাশ্যে না আসে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বস্তার ভিতরে ইট-পাথর থাকার কারণেই দেহটি দীর্ঘদিন কুয়োর তলায় তলিয়ে ছিল। ভবানীর নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজাতেই পরে থানায় গিয়ে ডায়েরি করেন অভিযুক্ত বাবা। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তথ্যপ্রমাণ এবং স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ধারায় খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে। শুক্রবার ধৃত ঈশান মালকে বাঁকুড়া জেলা আদালতে (Bankura District Court) তোলা হয়। বাঁকুড়ার পুলিশ সুপার সৌম্যদীপ ভট্টাচার্য (Saumadeep Bhattacharya) জানিয়েছেন, ‘নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তদন্তে আরও কেউ যুক্ত কি না, সেই দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে পারিবারিক সহিংসতা, সম্পত্তি ও আশ্রয় সংক্রান্ত মানসিকতার উপর। নিজের সন্তানকে ঘর থেকে তোলার জন্য এমন নৃশংস পথ বেছে নেওয়ার ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ভবানীর মৃত্যু যেন নিছক একটি খুনের ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক অসহিষ্ণুতা ও মানবিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Tripura Student Angel Chakma Murder in Dehradun: Biplab Deb Speaks to Uttarakhand CM |দেরাদুনে ত্রিপুরার ছাত্র এঞ্জেল চাকমা হত্যাকাণ্ড: উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব




