সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ধর্মশালা : হিমাচল প্রদেশের (Himachal Pradesh) ধর্মশালার একজন কলেজ ছাত্রী দীর্ঘদিন ধরেই র্যাগিং ও যৌন নির্যাতনের শিকার ছিলেন, চিকিৎসা ও কষ্টের শেষে গত ২৬ ডিসেম্বর লুধিয়ানার (Ludhiana) একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নির্যাতিতার মৃত্যু হয়। মেয়ের মত্যুর পর প্রতিকূল ঘটনার কথা জানিয়ে তাঁর বাবা পুলিশে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে তদন্তে নামেন পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে ওই কলেজের এক অধ্যাপক ও তিন ছাত্রীর নাম উঠে আসে; তাদের বিরুদ্ধে র্যাগিং, শারীরিক লাঞ্ছনা, ভয়-ভীতি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ পোক্ত করার নোটিশে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, নিহত ওই ছাত্রীর পিতা অভিযোগে বলেছেন, ‘আমার কন্যাকে কলেজে সিস্টেম্যাটিকভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হত; তাদের এই আক্রমণের ফলে মেয়ের শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হয়ে আসে।’ পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হলেও অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসে না; পরবর্তীতে লুধিয়ানার ওই হাসপাতালের চিকিৎসা দলে তীব্র অবনতি দেখে মৃত্যুর রেশ কাটাতে পারেনি।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক প্রমাণ-রেকর্ড পর্যালোচনার পরে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশের একটি কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ করা হয়নি) সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘অভিযোগগুলোর সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যাচাই করা হচ্ছে; র্যাগিং, শারীরিক অত্যাচার, ভয় দেখানো এবং যৌন হয়রানি এই সকল দিক খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি মৃত ছাত্রীর শারীরিক অসুস্থতার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করার জন্য হাসপাতাল নথি, মেডিকেল রিপোর্ট ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।’ এই শোকাবহ ঘটনায় কলেজ প্রশাসনকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, র্যাগিং প্রতিরোধে থাকা প্রয়োজনীয় কমিটি ও সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। হিমাচল প্রদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে র্যাগিং নিবারণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও নীতি চালু আছে; পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে কলেজের অভ্যন্তরীণ রেকর্ড, অনুষ্ঠানের লগবুক, সিসিটিভি ফুটেজ (যদি থাকে) ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হবে।
ঘটনাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম ঠাকুর (Jairam Thakur) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেন, ‘যৌন হয়রানি ও র্যাগিং দু’টোই অমানবিক; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করতে হবে। এই মামলায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত যাতে দোষীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।’ স্থানীয় রাজনৈতিক মহলও নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছে। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ আরও কয়েকটি দিক তদন্তে জোর দিচ্ছে, অভিযোগকারীর চিকিৎসার সব নথি সংগ্রহ, চিকিৎসক সাক্ষ্য, হাসপাতালের আইসিইউ ও ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, এবং কোভিড বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক মেডিকেল ইতিহাসের দিকও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে তদন্তকারীরা। যদি চিকিৎসাজনিত মৃতুঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ধরা পড়ে, তাতেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিভাবকরা আর স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেবল পাঠ্যক্রম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দেখা যাবে না; ছাত্রছাত্রীদের মানসিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।’ এক শিক্ষাগত সমাজকর্মী বলেন, ‘র্যাগিং-এর বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় ছোট করে দেখা হয়; কিন্তু মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব দরিদ্র ও দূর্দশাগ্রস্ত পরিবারগুলোতে অগণিত কষ্ট ডেকে আনে।’
তদন্তকারী পুলিশ অফিসাররা বলছেন, কাজের পরিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত অধ্যাপক ও তিন ছাত্রীর জিজ্ঞাসাবাদ চলছে; প্রয়োজন হলে আরও গ্রেফতারি হতে পারে। ঘটনার স্বরূপ ও ঘটনার ধরণ অনুযায়ী আদালতের নির্দেশে অভিযোগ রেকর্ড করে আইনী কাজ শুরু করা হয়েছে। পুলিশের কথায়, ‘প্রমাণের ভিত্তিতে আদৌ কোনও শিক্ষার্থী বা অধ্যাপক নৈতিক ও অপরাধমূলকভাবে দায়ী হন কি না, সেই বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য যে, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিদ্যালয়-কলেজগুলোতে র্যাগিং-বিরুদ্ধে কড়া বার্তা ও সচেতনতার দাবি জোরাল হচ্ছে। অনেক মানবাধিকার সংগঠন ও ছাত্রসংঘ থেকে একযোগে অনুরোধ করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও নিপীড়ন বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হোক, তদারকির কলাকৌশল জোরদার করা হোক এবং ভিকটিম সাপোর্ট মেকানিজম (মনোবিদ, কাউন্সেলিং, নিরাপদ হেল্পলাইন) নিশ্চিত করা হোক। এদিকে নিহত ছাত্রীর পরিবার এখনও শোক ও ক্ষতে জর্জরিত। বাবা-মা ও নিকটজনেরা চান, দ্রুততমভাবে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনও পরিবার এমন দুঃখভোগ না করে। তারা চাইছেন, এই ঘটনার তদন্তে সরকারী স্তরেও আগ্রহী হওয়া হোক যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ নির্ভরযোগ্যভাবে নিরাপদ করা যায়। এখনও পর্যন্ত ঘটনার কোনও সম্পূর্ণ ব্যক্তির-নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং তদন্তের ধারাবাহিকতায় নতুন তথ্যসমূহ ধীরে ধীরে পুলিশের হাতে আসছে। প্রতি ধাপে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আপডেট দেবেন বলে জানিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা দফতর এই ঘটনার তদন্তে সম্মিলিতভাবে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে উল্লেখ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Mobile Recharge Cost in India | মোবাইল রিচার্জের বাড়তি চাপ: সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার, জরুরি পদক্ষেপের দাবি




