দেবব্রত সরকার, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গান্ধীনগর : গুজরাট (Gujarat) মানেই শুধু শিল্প বা বাণিজ্য নয়, এই রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছে দুগ্ধ শিল্প। দুধ উৎপাদন এখানে আর নিছক কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি লক্ষ লক্ষ পশুপালক পরিবারের জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার। সমবায় ব্যবস্থার সুদৃঢ় কাঠামো, রাজ্য সরকারের সক্রিয় সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গুজরাটে তৈরি হয়েছে এক অনন্য দুগ্ধ বিপ্লব, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গ্রামীণ কৃষক ও পশুপালকেরা। গুজরাট সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি দশটি গ্রামের জন্য রয়েছে অন্তত একটি পশু চিকিৎসালয়। রাজ্য জুড়ে ২,২০০ -এরও বেশি পশু চিকিৎসক (Veterinary Doctors) প্রায় ১৮,০০০ গ্রামের পশুপালকদের পরিষেবা দিচ্ছেন। এর ফলে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যরক্ষা যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনই বেড়েছে দুধের গুণমান ও উৎপাদনক্ষমতা। নিয়মিত টিকাকরণ, রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবার মাধ্যমে পশুপালকেরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিন্তে তাঁদের জীবিকা পরিচালনা করতে পারছেন।

এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুফল হল দুধ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও মান নিয়ন্ত্রণ। সুস্থ গবাদিপশু মানেই বেশি ও উন্নতমানের দুধ, এই সরল সত্যকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে গুজরাটের দুগ্ধ ব্যবস্থা। গ্রামীণ এলাকাগুলিতে পশু চিকিৎসালয়ের উপস্থিতি শুধু পশুর জীবনই বাঁচাচ্ছে না, পরিবারগুলির আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করছে।
অন্যদিকে, গুজরাটের দুগ্ধ শিল্পের কথা বলতে গেলে ‘আমুল’ (Amul) -এর নাম স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা এফএসএসএআই (FSSAI) -এর নির্দেশিকা মেনে আমুল বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য দুগ্ধ ব্র্যান্ড। রাজ্য সরকারের নীতি সহায়তায় এবং সমবায় ব্যবস্থার শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আমুল একটি সুসংগঠিত দুধ সংগ্রহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। গ্রাম স্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজার, এই দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রতিটি ধাপেই রয়েছে স্বচ্ছতা ও মান নিয়ন্ত্রণের ছাপ।
বর্তমানে আমুলের দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রায় ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু সংস্থার সুনামই বাড়ছে না, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের (India) দুগ্ধ শিল্পের গ্রহণযোগ্যতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ পশুপালকেরা যে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রগুলিতে দুধ দেন, সেই দুধই প্রক্রিয়াজাত হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশের বাজারে, এই ভাবনাটাই তাঁদের কাছে গর্বের।এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে সমবায় মডেল। দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, সব জায়গাতেই পশুপালকেরা অংশীদার। ফলে লাভের অংশ সরাসরি তাঁদের হাতেই পৌঁছয়। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে যাওয়ায় দুধের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন উৎপাদকরা। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে স্থায়িত্ব, যা অন্য অনেক রাজ্যের কাছেও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল (Bhupendra Patel) -এর নেতৃত্বে গুজরাট সরকার দুগ্ধ শিল্পকে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট, প্রতিটি ফোঁটা দুধ যেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা, এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে গুজরাটের দুগ্ধ নীতি গড়ে উঠেছে। আবার, দুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। ডিজিটাল পেমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় দুধ সংগ্রহ ব্যবস্থা, গুণমান পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্র, সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যবস্থাকে করা হয়েছে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ। ফলে পশুপালকেরা সময়মতো তাঁদের প্রাপ্য পাচ্ছেন এবং উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্যও সহজে জানতে পারছেন।
গুজরাটের গ্রামীণ মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নেও দুগ্ধ শিল্প বড় ভূমিকা নিচ্ছে। বহু মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী দুধ সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে পরিবারে তাঁদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ছে। দুধ বিক্রির আয় দিয়ে সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজরাটের এই দুগ্ধ বিপ্লব শুধু রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় স্তরে ভারতের দুগ্ধ শিল্পের ভবিষ্যৎ দিশা নির্ধারণও করছে। সমবায় ব্যবস্থা, সরকারি সহায়তা এবং প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ, এই তিনের মেলবন্ধন যে কীভাবে গ্রামীণ সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারে, গুজরাট তার জীবন্ত উদাহরণ। এক্ষেত্রে, গুজরাটে দুধ এখন শুধু পুষ্টির উৎস নয়; এটি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অগ্রগতির নিদর্শনও। প্রতিটি ফোঁটা দুধের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক-একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং সমৃদ্ধির গল্প। এই গল্পই আজ গুজরাটকে দেশের দুগ্ধ মানচিত্রে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rashtra Prerna Sthal Lucknow | লখনউতে জাতীয় চেতনার নতুন ঠিকানা, রাষ্ট্র প্রেরণা স্থলের কাজ খতিয়ে দেখলেন যোগী আদিত্যনাথ




