সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন দু’টি নাম রয়েছে, যাদের ছায়া গত চার দশক ধরে একে অপরের উপর পড়েছে, খালেদা জিয়া (Khaleda Zia) ও শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। একজন ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, অন্যজন দেশের দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। সময়ের পরতে পরতে তাঁদের দ্বন্দ্ব শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা এমনকী রাস্তায় রাস্তায় হিংসা ও অচলাবস্থার মধ্যেও। একসঙ্গে জেলে যাওয়া থেকে শুরু করে একে অপরকে রাজনীতি থেকে মুছে দেওয়ার লড়াই, বাংলাদেশের ‘দুই বেগম’-এর সংঘাত আজ ইতিহাসের অংশ।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে প্রবেশের পেছনে রয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত অধ্যায়। শেখ হাসিনা হলেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান (Sheikh Mujibur Rahman) -এর কন্যা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক ষড়যন্ত্রে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা (Sheikh Rehana)। সেই শোক ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার উত্থান। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনও জন্ম নেয় গভীর ট্র্যাজেডি থেকে। তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman) ছিলেন বাংলাদেশের সেনা প্রধান। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি এবং পরে রাষ্ট্রপতি হন। জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশ কল্পনা করেছিলেন, তা ছিল ইসলামি জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত, যা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার শিকার হন। স্বামীর মৃত্যুর পরই রাজনীতির ময়দানে নামতে বাধ্য হন খালেদা জিয়া এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (Bangladesh Nationalist Party) -এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
শুরুর দিকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সম্পর্ক একেবারে শত্রুতায় পরিণত হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে সেনাশাসক হুসেন মহম্মদ এরশাদ (Hussain Muhammad Ershad) ১৯৮২ সালে মার্শাল ল জারি করলে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। তখন আওয়ামী লিগ (Awami League) ও বিএনপি আলাদা আলাদা আন্দোলন করলেও খুব দ্রুত বোঝা যায়, একা একা এরশাদকে সরানো সম্ভব নয়। সেই সময়েই বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজনে একত্রিত হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। লাগাতার হরতাল, বিক্ষোভ ও জনআন্দোলনের চাপে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এরশাদ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।কিন্তু এরশাদ পতনের পর থেকেই দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত দূরত্ব দ্রুত রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। ১৯৯০-এর শেষ ভাগ থেকে শুরু হয় নির্বাচনী রাজনীতির তীব্র লড়াই। ক্ষমতায় থাকা মানেই প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা, এই মানসিকতা গ্রাস করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে। কখনও দুর্নীতির অভিযোগ, কখনও গ্রেপ্তার, কখনও প্রশাসনিক চাপে বিরোধীদের দমন, দু’পক্ষই এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফলে বাংলাদেশের রাস্তায় নিয়মিত বনধ, সংঘর্ষ ও হিংসা নিত্যদিনের অর্থ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। খালেদা জিয়া দাবি করেন, এই ব্যবস্থাই মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের একমাত্র ভরসা। শেখ হাসিনা উল্টো বলেন, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিপন্থী। এই মতভেদের জেরেই ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং কেয়ারটেকার সরকারের আমলে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একসঙ্গে গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ঘটনা নজিরবিহীন। এক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক ও আইনি চাপে তাঁরা মুক্তি পান। ২০১১ সালে শেখ হাসিনার সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। বিএনপি এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি ও বয়কটের অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয় খালেদা জিয়ার। অসুস্থতার কারণে পরে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি মিললেও কার্যত তিনি রাজনীতির বাইরে চলে যান।
একদিকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ছবি উঠে আসে, অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা খর্ব করা এবং সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বদলে যায় রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন মহম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে ফেরেন তারেক রহমান (Tarique Rahman)। কিন্তু খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বিএনপি নেতৃত্বে তৈরি হয় শূন্যতা।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ত আর সেই পুরনো ‘খালেদা-হাসিনা’-এর দ্বন্দ্ব দেখবে না। কিন্তু শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার চার দশকের লড়াই বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রচিন্তাকে যে ভাবে প্রভাবিত করেছে, তা ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Begum Khaleda Zia death, Narendra Modi condolence message | খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




