সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ফের বড়সড় ধাক্কা। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে (Punjab National Bank – PNB) প্রকাশ্যে এল প্রায় ২৪৩৪ কোটি টাকার ঋণ প্রতারণার ঘটনা। ব্যাঙ্কের তরফেই এই তথ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াকে (Reserve Bank of India) জানানো হয়েছে। দু’টি আর্থিক সংস্থার প্রোমোটারদের বিরুদ্ধে এই বিপুল অঙ্কের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ঋণ মঞ্জুরি, নজরদারি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা নিয়ে। পিএনবি সূত্রে খবর, ব্যাঙ্কের নতুন দিল্লি শাখা থেকে দু’টি সংস্থাকে মোট ২৪৩৪ কোটি টাকারও বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে এসআরইআই ইকুইপমেন্ট ফিন্যান্স লিমিটেডকে (SREI Equipment Finance Limited) দেওয়া হয় ১২৪০.৯৪ কোটি টাকা এবং এসআরইআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স লিমিটেড (SREI Infrastructure Finance Limited) দেওয়া হয় ১১৯৩.০৬ কোটি টাকা। পরবর্তীকালে এই ঋণ সংক্রান্ত নথি এবং লেনদেন খতিয়ে দেখে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, এখানে গুরুতর অনিয়ম ও প্রতারণার উপাদান রয়েছে।
ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় এই ঘটনাকে ‘বরোয়াল ফ্রড’ (Borrowal Fraud) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণগ্রহীতা সংস্থা বা তাদের প্রোমোটাররা ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুয়ো তথ্য দিয়ে, প্রকৃত আর্থিক অবস্থান গোপন করে অথবা ঋণের টাকা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য খাতে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে প্রতারণা করেছে, এমনটাই ব্যাঙ্কের প্রাথমিক মূল্যায়ন। এই ধরনের প্রতারণা ধরা পড়লে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের পাশাপাশি গোটা আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া একটি ফাইলিংয়ে জানিয়েছে, এই বিপুল বকেয়া ঋণের পুরো অঙ্কের জন্য তারা ইতিমধ্যেই পূর্ণ প্রভিশন করেছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য ক্ষতির কথা মাথায় রেখে ব্যাঙ্ক তাদের হিসাবখাতায় এই টাকার জন্য আগাম সংস্থান রেখেছে। এর ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে ব্যাঙ্কের লাভের অঙ্কে চাপ পড়লেও ভবিষ্যতে আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা।ব্যাঙ্ক আরও জানিয়েছে, জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল (National Company Law Tribunal বা NCLT)-এর অধীনে কর্পোরেট ইনসলভেন্সি রেজোলিউশন প্রক্রিয়া (Corporate Insolvency Resolution Process বা CIRP) মারফত এই দুই সংস্থার সমস্যা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই ঋণ পুনর্গঠন বা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ব্যাঙ্ক তার পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছে। তবে এত কিছুর পরেও ঋণ প্রতারণার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল।
এসআরইআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। দীর্ঘদিন ধরে এই সংস্থা পরিকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অন্য দিকে, এসআরইআই ইকুইপমেন্ট ফিন্যান্স লিমিটেডও শিল্প ও নির্মাণ ক্ষেত্রের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঋণ দেওয়ার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই সংস্থার আর্থিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ২০২১ সালে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।আরবিআই ২০২১ সালে এই দুই সংস্থার বিরুদ্ধে দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তখন এসআরইআই গোষ্ঠীর বোর্ডও বাতিল করে দেয় এবং প্রশাসক নিয়োগ করে। আরবিআইয়ের বক্তব্য ছিল, সংস্থাগুলির আর্থিক অনিয়ম, ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি এবং কর্পোরেট গভার্ন্যান্সের ঘাটতি আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় এই দুই সংস্থার মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
পিএনবি-তে এই ২৪৩৪ কোটি টাকার ঋণ প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই ব্যাঙ্কিং খাতে পুরনো ক্ষত আবার টাটকা হয়ে উঠেছে। এর আগে নীরব মোদী (Nirav Modi) এবং মেহুল চোকসি -এর (Mehul Choksi) মতো ঘটনার জেরে পিএনবি দেশজুড়ে শিরোনামে এসেছিল। যদিও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমান ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঋণগুলি অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল এবং এখন কেবল সেগুলিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘ফ্রড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তথাপি প্রশ্ন উঠছে, এত বড় অঙ্কের ঋণ মঞ্জুরির সময় ঝুঁকি যাচাই কতটা কঠোর ছিল, কেন আগেভাগে সতর্ক সংকেত ধরা পড়েনি এবং কী ভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এই অনিয়ম নজরের বাইরে থেকে গেল। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে কর্পোরেট ঋণের ক্ষেত্রে আরও শক্ত নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। এই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং অর্থ মন্ত্রক পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে বলেই সূত্রের খবর। ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা ঠেকাতে ঋণ অনুমোদন ও নজরদারি ব্যবস্থায় আরও কড়াকড়ি আসতে পারে। পিএনবি -এর এই ঋণ প্রতারণা শুধু একটি ব্যাঙ্কের সমস্যা নয়, বরং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nehal Modi Arrested, PNB 13500 crore fraud | নীরব মোদীর ভাই গ্রেফতার: ১৩ হাজার কোটির PNB কেলেঙ্কারির ছায়ায় ফের উত্তাল আন্তর্জাতিক মহল



