সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : ভারতীয় মুদ্রাবাজারে ফের বড়সড় অস্থিরতা। মঙ্গলবার ডলারের (US Dollar) বিরুদ্ধে ২৩ পয়সা দুর্বল হয়ে সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে গিয়ে পৌঁছাল ভারতীয় মুদ্রা রুপি (Indian Rupee)। দিন শেষে রুপি বন্ধ হল ১ ডলারের বিপরীতে ৯১.০১ স্তরে (প্রোভিশনাল)। এর আগেও দিনের মধ্যে আরও বড় পতন দেখা গিয়েছিল। এক সময় রুপি ভেঙে পড়ে ৯১.১৪ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সার্বিকভাবে মুদ্রাবাজারে উদ্বেগ কাটেনি।
রাজ্যসভায় এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠার পর কেন্দ্রীয় সরকার জানায়, রুপির এই লাগাতার পতনের পিছনে অন্যতম কারণ দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি (India-US Trade Agreement) সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অগ্রগতি। সরকারের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশীয় মুদ্রার উপর। বিদেশি মুদ্রা বাজারের (Forex Market) বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক এই কারণে যে, বিশ্ববাজারে ডলার তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকা সত্ত্বেও এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও রুপির পতন ঠেকানো যায়নি। সাধারণত তেলের দাম কমলে আমদানি খরচ কমে এবং রুপির উপর চাপ কিছুটা হালকা হয়। কিন্তু এ দিন সেই চেনা সমীকরণ কার্যত কাজ করেনি।
মঙ্গলবারের লেনদেনে দেখা যায়, আগের দিনের ক্লোজিংয়ের তুলনায় রুপি প্রথম থেকেই চাপে ছিল। দিনের মধ্যভাগে এক ধাক্কায় ৩৬ পয়সা পড়ে গিয়ে ৯১.১৪ ছুঁয়ে ফেলে রুপি। পরে কিছু ক্রয়মূল্য সমর্থন এবং বাজারে হস্তক্ষেপের জল্পনায় কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত নতুন রেকর্ড নিম্নস্তরেই দিন শেষ হয়। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০টি ট্রেডিং সেশনে রুপি ৯০ থেকে সরাসরি ৯১ স্তরে নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, গত পাঁচটি ট্রেডিং সেশনেই প্রায় ১ শতাংশ দুর্বল হয়েছে দেশীয় মুদ্রা। এই দ্রুত পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
রাজ্যসভায় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ‘দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আমদানির পরিমাণ রপ্তানির তুলনায় বেশি হওয়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। তার পাশাপাশি ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত কিছু চলমান বিষয়ও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।’ সরকারের মতে, এই দুই কারণ মিলেই রুপির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, রুপির এই পতন দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি, ইলেকট্রনিক্স এবং সার আমদানির খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপরই পড়তে পারে, কারণ আমদানি খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে, রপ্তানিকারকদের জন্য এই দুর্বল রুপি কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে। ডলারের বিপরীতে রুপি দুর্বল হলে রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় বাড়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, অতিরিক্ত দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। এক অর্থনীতিবিদের কথায়, ‘রপ্তানিতে সাময়িক সুবিধা মিললেও মুদ্রার এত দ্রুত পতন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন তুলে দেয়।’ উল্লেখ্য, মুদ্রাবাজারের সঙ্গে যুক্ত এক ফরেক্স ট্রেডার জানান, ‘এই মুহূর্তে বাজারে স্নায়ুচাপ স্পষ্ট। ডলারের চাহিদা বেশি, অথচ বিশ্ববাজার থেকে তেমন কোনও ইতিবাচক সংকেত আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে রুপি আরও কিছুদিন চাপের মধ্যেই থাকতে পারে।’ তাঁর মতে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) পরিস্থিতির দিকে নজর রাখলেও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও হস্তক্ষেপ চোখে পড়েনি।
রুপির এই পতন রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক তৈরি করেছে। বিরোধীদের দাবি, সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ব্যর্থতাই এর জন্য দায়ী। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল সমীকরণই মূলত দায়ী। ডলারের বিপরীতে রুপির নতুন সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছনো ভারতের অর্থনীতির সামনে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল। বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বিষয়গুলিতে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে রুপির গতিপথ। আপাতত বাজারের চোখ আগামী কয়েকটি ট্রেডিং সেশনের দিকে, যেখানে রুপি আরও নামবে নাকি কিছুটা স্থিতিশীল হবে, সেটাই দেখার।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Koel Mallick Shooting Accident, Mitin Movie Release Update | শুটিং সেটে দুর্ঘটনায় কোয়েল মল্লিক, মিতিন একটি খুনের সন্ধানে বড়দিনে মুক্তি



