সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের বিমা শিল্পে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল সংসদের মঞ্চে। মঙ্গলবার লোকসভায় ‘সবকা বিমা সবকি রক্ষা (বিমা আইন সংশোধনী) আইন, ২০২৫’ শীর্ষক বিল পেশ করে কেন্দ্রীয় সরকার বিমা ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI) অনুমোদনের পথ খুলে দিল। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ (Nirmala Sitharaman) বিলটি পেশ করার পরেই সংসদে শুরু হয় জোর বিতর্ক। সরকারের দাবি, এই বিল বিমা পরিষেবার প্রসার ঘটাবে এবং দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিমার আওতায় আনতে সাহায্য করবে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ দেশের বিমা শিল্পকে বিদেশি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

বিল পেশের সময় অর্থমন্ত্রী ভাষায় জানান, বিমা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তাঁর কথায়, ‘সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য বিমা অত্যন্ত জরুরি। কোভিড অতিমারির মতো কঠিন সময়েও কেন্দ্র সরকার সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে বিমা পৌঁছে দিয়েছে। এই সংশোধনের লক্ষ্য বিমা পরিষেবাকে আরও বিস্তৃত করা।’ নির্মলা আরও বলেন, সংসদে বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলে তিনি বিরোধীদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত।বর্তমানে ভারতের বিমা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৭৪ শতাংশ। নতুন বিলে সেই সীমা তুলে দিয়ে সরাসরি ১০০ শতাংশ বিদেশি লগ্নির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে বিদেশি সংস্থাগুলি ভারতীয় অংশীদার ছাড়াই বিমা সংস্থা গঠন করতে বা বিদ্যমান কোনও সংস্থার মালিকানা নিতে পারবে। যদিও সরকারের তরফে শর্ত রাখা হয়েছে, ভারতে সংগৃহীত বিমার প্রিমিয়ামের সম্পূর্ণ অর্থ দেশেই বিনিয়োগ করতে হবে।
কেন্দ্রের এই প্রস্তাব ঘিরে সংসদে বিরোধী শিবির সরব হয়ে ওঠে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সৌগত রায় (Sougata Roy) বিলের নামকরণ নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ‘বিলের নামটা শুনলে মনে হচ্ছে শাসক দলের রাজনৈতিক স্লোগান। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই ধরনের নাম গ্রহণযোগ্য নয়।’ একই সঙ্গে তিনি ১০০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবকে ‘পশ্চাদমুখী সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেন। সৌগতের অভিযোগ, এতে দেশের বিমা শিল্পের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ গ্রাহকের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়বে। বিরোধীদের আরও দাবি, বিমা শিল্প শুধুমাত্র লাভের জন্য নয়, সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সম্পূর্ণ বিদেশি লগ্নির অনুমতি দিলে বহুজাতিক সংস্থাগুলি লাভজনক বাজারের দিকেই বেশি নজর দেবে, গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের বিমা সুরক্ষা উপেক্ষিত হতে পারে। বিমা কর্মীদের সংগঠনের একাংশও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বিদেশি লগ্নিকারীরা ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা’র পরিবর্তে মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি ভিন্ন। সরকারের মতে, বিমা শিল্পে আরও বেশি মূলধন প্রবেশ করলে নতুন প্রযুক্তি, উন্নত পরিষেবা এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম কমতে পারে এবং পরিষেবার মান বাড়বে। বাজেট পেশের সময়ই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এই সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বিমা শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটিয়ে দেশের প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই বিল আইনে পরিণত হলে ভারতের বিমা বাজার আন্তর্জাতিক স্তরে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। বিশ্বের বহু বড় বিমা সংস্থা এতদিন ভারতীয় অংশীদার বাধ্যতামূলক হওয়ার কারণে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি। নতুন আইনে সেই বাধা কাটবে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআইকে (IRDAI) আরও শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে, যাতে গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। লোকসভায় বিল পেশের দিনই সরকার জানিয়ে দেয়, এটি শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমা খাতে বিদেশি লগ্নি বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ডিজিটাল বিমা পরিষেবার প্রসার ঘটবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিই উপকৃত হবে। উল্লেখ্য, বিমা ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সংসদে এই বিল নিয়ে বিস্তারিত বিতর্কে সরকার ও বিরোধীদের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে। শেষ পর্যন্ত এই সংশোধনী আইন আকারে কার্যকর হলে, তা ভারতের বিমা শিল্পের ভবিষ্যৎ পথচলাকে নতুন দিশা দেখাবে, এ কথা বলাই যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lok Sabha Bills, SHANTI Bill | লোকসভায় বড় সংস্কারের ইঙ্গিত, পরমাণু শক্তি থেকে শিক্ষা, তিনটি নতুন বিল পেশ করল মোদী সরকার




