বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : ঘন ধোঁয়াশায় ঢেকে গেল রাজধানী দিল্লি (Delhi)। সোমবার সকালে শহর জুড়ে যে দৃশ্য চোখে পড়েছে, তা কার্যত শ্বাসরুদ্ধকর। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা AQI পৌঁছে গিয়েছে ৪৯৮-এ, যা ‘গুরুতর’ বা ‘সিভিয়ার’ শ্রেণির সর্বোচ্চ সীমার একেবারে কাছাকাছি। বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে দিন শুরু করতে বাধ্য হলেন দিল্লিবাসী। বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ চিত্র শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (Central Pollution Control Board – CPCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিল্লির ৪০টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টিতেই বাতাসের মান ‘সিভিয়ার’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাকি দু’টি স্টেশনে বাতাসের মান ছিল ‘ভেরি পুওর’। সব থেকে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে জাহাঙ্গিরপুরী (Jahangirpuri) এলাকায়, যেখানে AQI রেকর্ড করা হয়েছে ৪৯৮। অর্থাৎ, কার্যত সর্বোচ্চ দূষণের কাছাকাছি অবস্থান করছে এই এলাকা।CPCB-এর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, AQI যদি ০ থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকে, তা হলে বাতাসকে ‘ভাল’ বলা হয়। ৫১ থেকে ১০০ ‘সন্তোষজনক’, ১০১ থেকে ২০০ ‘মাঝারি’, ২০১ থেকে ৩০০ ‘খারাপ’, ৩০১ থেকে ৪০০ ‘অত্যন্ত খারাপ’ এবং ৪০১ থেকে ৫০০ হলে তা ‘গুরুতর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টতই শেষ শ্রেণির মধ্যেই পড়ছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে মানবদেহের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
উল্লেখ্য যে, রবিবারই দিল্লির AQI উঠেছিল ৪৬১-এ। সেটি ছিল চলতি শীতের মরসুমে শহরের সবচেয়ে দূষিত দিন এবং ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষণের রেকর্ড। একদিনের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে সোমবার তা ৪৯৮-এ পৌঁছনো, বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যন্ত উদ্বেগজনক ইঙ্গিত। দুর্বল হাওয়া এবং নিম্ন তাপমাত্রার জেরে দূষণ কণাগুলি বাতাসে আটকে থেকে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। দূষণের ভয়াবহতার আর একটি উদাহরণ মিলেছে ওয়াজিরপুর (Wazirpur) এলাকায়। সেখানে থাকা বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি দিনের একটি সময়ে AQI-এর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য মান ৫০০ রেকর্ড করেছে। এর বেশি হলে CPCB আর ডেটা নথিভুক্ত করে না। অর্থাৎ, বাস্তবে দূষণের মাত্রা কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, তা পরিমাপের সীমারও বাইরে চলে গিয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদদের একাংশ। দিল্লির বাতাস নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাসও দিয়েছে এয়ার কোয়ালিটি আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (Air Quality Early Warning System – AQEWS)। সংস্থার মতে, আগামী কয়েক দিনেও দিল্লির বাতাস ‘সিভিয়ার’ স্তরেই থাকার আশঙ্কা রয়েছে। পরবর্তী ছ’দিনের পূর্বাভাসেও জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সামান্য উন্নতি হলেও বাতাস ‘ভেরি পুওর’ স্তরের নীচে নামার সম্ভাবনা খুবই কম।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে আবহাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (India Meteorological Department – IMD)। সংস্থার মতে, বর্তমানে দিল্লিতে গড় বাতাসের গতিবেগ ১০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টারও কম। এই ধরনের ধীরগতির হাওয়া দূষণ ছড়িয়ে দিতে অক্ষম। ফলে গাড়ির ধোঁয়া, শিল্পাঞ্চলের নির্গমন এবং অন্যান্য দূষণকারী কণা শহরের উপরিভাগেই আটকে থাকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতের কম তাপমাত্রা, যা বাতাসের স্তরবিন্যাস ঘটিয়ে দূষণকে আরও ঘনীভূত করছে।IMD জানিয়েছে, সোমবার দিল্লিতে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা। যদিও এই তাপমাত্রা শীতের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক, কিন্তু বাতাসের স্থবিরতার কারণে দূষণ ছড়াতে পারছে না। ফলে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও বাতাসের মান ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, এই ধরনের দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকলে শ্বাসযন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। শিশু, প্রবীণ নাগরিক এবং যাঁদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। চোখে জ্বালা, গলায় জ্বালা, মাথাব্যথা ও শ্বাস নিতে কষ্ট, এই উপসর্গগুলি ইতিমধ্যেই বহু বাসিন্দার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। দূষণের জেরে দিল্লির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। সকালের দিকে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের তরফে একাধিক বিধিনিষেধ আগেই জারি করা হয়েছে, তবে বর্তমান আবহাওয়া অনুকূল না হওয়ায় সেগুলির প্রভাব সীমিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।শীতের শুরুতেই দিল্লির বায়ুদূষণ আবারও চরম আকার ধারণ করেছে। AQI ৪৯৮ ছুঁয়ে যাওয়া এটি রাজধানীর বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের উপর নেমে আসা এক নীরব বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। আবহাওয়া ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ মিলিয়ে পরিস্থিতি কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Delhi Airport Fog, Flight Cancellations | ঘন কুয়াশায় স্তব্ধ দিল্লি বিমানবন্দর, বাতিল ৬০-এর বেশি উড়ান, দেরিতে ২৫০-এরও বেশি ফ্লাইট




