সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জোহানেসবার্গ : জোহানেসবার্গে চলমান জি২০ সম্মেলনের গম্ভীর পরিবেশের মাঝেই রবিবার আলোচনায় বসলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা (Cyril Ramaphosa)। দুই দেশের দীর্ঘকালীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন করে সামনে এনে উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বিস্তারের রূপরেখা তৈরি করলেন। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভারত–দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্ক আরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই গুরুত্বই প্রতিফলিত হল এই বৈঠকে।
জি২০-এর সাইডলাইনে আয়োজিত বৈঠকে দুই দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম মেধা, দক্ষতা বৃদ্ধি, বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এ-সবকিছুই উঠে আসে আলোচনায়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র বলেন, “ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক শুধু ঐতিহাসিক নয়, ভবিষ্যতকেন্দ্রিকও। আমাদের সহযোগিতা আগামী দিনে বহুমুখী উন্নয়নের পথ দেখাবে।” অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট রামাফোসা জানান, “উদীয়মান বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষিতে ভারত আমাদের এক অনন্য কৌশলগত অংশীদার। প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।”
দুই দেশের নেতাদের আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও দক্ষতা উন্নয়ন (Skilling) সংক্রান্ত অংশীদারিত্ব। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্তমানে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। সেখানে ভারতের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করেন রামাফোসা। তাঁর ভাষায়, “ডিজিটাল ইকোনমির ক্ষেত্রে ভারতীয় মডেল রোল মডেল হতে পারে। আমরা চাই ভারত আমাদের পাশে থেকে এই যাত্রায় অংশ নিক।” এছাড়াও দু’দেশের আলোচনায় উঠে আসে ক্রিটিক্যাল মিনারেল বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের বিষয়। পরিষ্কার শক্তি, ইলেকট্রনিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে এই খনিজ সম্পদের ভূমিকা অপরিহার্য। দক্ষিণ আফ্রিকা এ ধরনের সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারত চাইছে এসব ক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতা গড়ে উঠুক। প্রধানমন্ত্রী মোদি বৈঠকে বলেন, “বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেন স্থিতিশীল করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খনিজ সম্পদ ক্ষেত্রে নতুন কর্মপরিকল্পনা বৈশ্বিক বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
সাংস্কৃতিক ও মানসিক যোগসূত্র নিয়েও আলোচনা হয়। দুই দেশেই গান্ধীজির প্রভাব গভীর, যা ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কের এক নমনীয় ভিত্তি তৈরি করেছে। মোদী বলেন, “দুই দেশের মানুষের মানসিক যোগাযোগ আমাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে।” রামাফোসা এ বিষয়ে যোগ করেন, “ভারতীয় সংস্কৃতি দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে আমরা আরও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি বাড়াতে চাই।”
উল্লেখ্য, উভয় দেশই গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভারত বর্তমান বৈশ্বিক মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও একই লক্ষ্যে কাজ করে। তাই আন্তর্জাতিক পরিসরে দুই দেশের সহযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। জি২০ -এর (G20) মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার এই নতুন অধ্যায় ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দৃশ্যপটকে শক্তিশালী করবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। প্রযুক্তি থেকে খনিজ সম্পদ, প্রতিটি খাতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরাতে সক্ষম বলেই মনে করা হচ্ছে। বৈঠকের শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্সি (The Presidency of the Republic of South Africa) একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, “দুই নেতার আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনা- সবই উঠে এসেছে। দুই দেশই সম্মত যে, ন্যায়সঙ্গত উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।” বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা আগামী দিনের বিশ্বে প্রযুক্তি-নির্ভর সহযোগিতা বাড়াতে বদ্ধপরিকর।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই বৈঠক কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়- তা নতুন এক কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর। বিশেষ করে এআই, স্কিলিং এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেল নিয়ে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার একত্রে কাজ করা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। জি২০ মঞ্চে মোদী-রামাফোসার এই আলোচনা দেখিয়ে দিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বন্ধুত্ব শুধুই অতীতনির্ভর নয়, তা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মানচিত্রে নতুন দিগন্ত তৈরি করবে। উভয় দেশই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতে চাইছে, এবং তাদের এই কো-অপারেশন বিশ্ব রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা বয়ে আনবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Australia strategic partnership, Modi Albanese meeting | ৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্বে নতুন গতি : মোদী-অ্যালবানিজ বৈঠকে প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি ও বাণিজ্য জোরদার করার বার্তা




