সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে আগামী ৭ ডিসেম্বর আয়োজিত হতে চলা সমবেত গীতাপাঠকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে নতুন করে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। ‘সনাতন সংস্কৃতি সংসদ’ এই সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতে চলা বৃহৎ গীতাপাঠ কর্মসূচীতে বার্তা পৌঁছে দিতে আরএসএস (RSS) সক্রিয়ভাবে প্রচারে নেমেছে। কিন্তু সেই প্রচারের মুখ হিসেবে তাঁরা যাঁর ভিডিও ব্যবহার করেছে, তা দেখে রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের পাশাপাশি নতুন আলোচনার সূত্রও খুলে গিয়েছে। কারণ ভিডিওতে আবৃত্তি করছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও একসময়ের কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় (Pranab Mukherjee)।
আরএসএসের তথ্যকেন্দ্র ‘বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র- দক্ষিণবঙ্গ’ (VSK South Bengal)-এর ফেসবুক পেজে টানা কয়েকদিন ধরে গীতাপাঠ কর্মসূচীর প্রচার চলছে। সেখানেই পোস্ট করা হয়েছে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের একটি পুরোনো ভিডিও, যেখানে তাঁকে শোনা যায়, “কুরুক্ষেত্র চিরস্তব্ধ ভীষণ সমর মন্দ্র / অন্তিম নতি লহ ভীষ্মের অস্তোন্মুখ চন্দ্র…” এই আবৃত্তি মূলত মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের প্রসঙ্গ, যা ব্যবহার হয়েছে সমবেত গীতাপাঠের মাহাত্ম্য তুলে ধরতে। আরএসএস- ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির প্রচারে প্রণবের কণ্ঠস্বর ফের ভেসে ওঠায় অনেকেই অবাক। বিশেষত কারণ, তাঁর জীবনের বড় অংশটাই কেটেছে কংগ্রেসের সঙ্গে এবং দলের শীর্ষপর্যায়ে তাঁর জায়গা ছিল অটল। গীতাপাঠ কর্মসূচীটি আয়োজিত হচ্ছে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কার্তিক মহারাজ (Swami Pradiptananda), জগদ্বন্ধু আশ্রমের বন্ধুগৌরব মহারাজ (Bandhugaurav Maharaj) এবং রিষড়া প্রেম মন্দিরের স্বামী নির্গুণানন্দ (Swami Nirgunananda) -এর নেতৃত্বে। আয়োজকেরা সাধারণ মানুষকে বৃহৎ সংখ্যায় উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আরএসএস -এর তরফ থেকেও প্রচারকে আরও বিস্তৃত করতে প্রণবের পুরোনো ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।অনেকের মতে, সাত বছর আগের এক স্মৃতির পুনরুজ্জীবনই যেন নতুন করে রাজনৈতিক আবহ তৈরি করেছে। ২০১৮ সালের ৭ জুন নাগপুরে আরএসএসের মঞ্চে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি সারা দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তুলেছিল। কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হওয়ার পরেও তাঁর সেই পদক্ষেপকে অনেকে ‘ঐতিহাসিক’ আবার কেউ কেউ ‘চমকপ্রদ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তখন থেকেই প্রণবের সঙ্গে আরএসএসের equation নিয়ে বিতর্ক চলছিল। এত বছর পরেও আরএসএস যখন তাঁদের প্রচারে প্রণবকে সামনে এনে হাজির করছে, তখন প্রশ্ন উঠছেই-এ কি নিছক শ্রদ্ধা, নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
আরএসএস দক্ষিণবঙ্গ প্রচারক বিপ্লব রায় (Biplab Roy) অবশ্য এই বিতর্ককে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, “প্রণব মুখোপাধ্যায় এই বাংলার এক বিশিষ্ট এবং সম্মাননীয় নাগরিক ছিলেন। মহাভারত কিংবা কুরুক্ষেত্রের গীতার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের উদ্ধৃতি ব্যবহার করার মধ্যেই তাৎপর্য রয়েছে।” তাঁর দাবি, এটি রাজনৈতিক প্রচারের জন্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও দর্শনগত প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। কিন্তু কংগ্রেস ভিন্নমত পোষণ করছে। প্রাক্তন সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য (Pradip Bhattacharya) বলেন, “ভিডিওতে প্রণববাবু যে ভাবনাটি তুলে ধরেছিলেন, তার গভীরতা আরএসএস আদৌ উপলব্ধি করতে পেরেছে কি না তা নিয়েই সন্দেহ আছে। সত্যিকারের মূল্য বুঝতে পারলে আজ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হত। আশা করি কোনওদিন তাদের মধ্যে সেই উপলব্ধি জন্মাবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গীতাপাঠ কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে আরএসএসের এই সক্রিয়তা এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পুরোনো ভিডিও ব্যবহার দুই দিক থেকেই বার্তাবাহী। একদিকে হিন্দুত্ব ঘরানার সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়ানোর প্রয়াস, অন্যদিকে প্রণবের মতো ‘সর্বজনগ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিত্বকে সামনে এনে একটি বৃহত্তর শ্রোতৃমণ্ডলীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। যদিও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, তাঁরা বিষয়টিকে নিছক সাংস্কৃতিক প্রচার হিসেবে দেখছেন না। উল্লেখ্য, ৭ ডিসেম্বরের গীতাপাঠ কর্মসূচি কত বড় মাপের জমায়েত করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে তার আগেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ভিডিও ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক বাংলার রাজনৈতিক মহলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্রিগেডের ময়দান যে আবার একবার রাজনৈতিক আবেগ, সাংস্কৃতিক উপাদান এবং মতাদর্শের সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল হতে চলেছে, তা অন্তত স্পষ্ট।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal politics, Samik Bhattacharya statement | ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা বন্ধ হলেই লাভ কার?’ শমীক ভট্টাচার্যর কটাক্ষে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক




