সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বলিউডের তারকা অভিনেত্রী ও মান্ডির সাংসদ কঙ্গনা রানাউত (Kangana Ranaut) আবারও এক মন্তব্যে সারা দেশে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। সমাজে কন্যাসন্তানকে ঘিরে মানুষের মনোভাব নিয়ে তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক মহল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া- সব জায়গাতেই ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। আজকের দিনে যখন মেয়েরা খেলাধুলো থেকে সেনাবাহিনী- সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে এগিয়ে, তখন কঙ্গনার বক্তব্য অনেকের কাছেই পিছিয়ে থাকা মানসিকতার পরিচয় বলে মনে হয়েছে।
একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে কঙ্গনা রানাউত বলেন, “এশিয়ার যেকোনও পরিবারে গিয়ে কথা বলুন। দ্বিতীয়বার যদি কন্যাসন্তান হয়, তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। পরিবার যতই শিক্ষিত হোক, মেয়েদের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রে বদলায় না। সবাই দেখাতে চান ছেলে-মেয়ে সমান, কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে মেয়ে হওয়ার পরেও সবার মনে এ নিয়ে সংশয় থাকে। বলিউড হোক বা বড় পরিবার—ছবিটা একই।” তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মানুষের প্রশ্ন- একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সাংসদ হয়েও কীভাবে এমন বদ্ধমূল ধারণা সমর্থন করতে পারেন কঙ্গনা! বিশেষ করে যখন নারীশক্তি আজ সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে, তখন তাঁর মন্তব্য নেটিজেনদের কাছে অপ্রত্যাশিত। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, “কঙ্গনা নিজেই নারী হয়েও নারীদের নিয়ে এ ধরনের ভাবনা প্রচার করে সমাজকে ভুল বার্তা দিচ্ছেন।” আরও একজন লিখেছেন, “তিনি কখনওই প্রগতিশীল মানসিকতার ছিলেন না। তাঁর মন্তব্যে আবারও তা প্রমাণিত।”
কিন্তু, বিতর্কের সঙ্গে কঙ্গনার নাম নতুন নয়। এর আগেও তাঁকে বহুবার এমন মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছে যা তাঁকে সমস্যার মুখে ফেলেছে। কৃষক আন্দোলনের সময় X -এ (পূর্বে টুইটার) তিনি এক বৃদ্ধা প্রতিবাদকারীকে ‘শাহিনবাগের দাদি’ বিলকিস বানো বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পাঁচ বছর পর সেই ঘটনার জন্য ভাতিন্দা আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে কঙ্গনা প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কঙ্গনা বলেন, “ভাতিন্দায় এসে আমার খুব ভাল লাগছে। আন্দোলনের সময় একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমি মাতাজির (বৃদ্ধা) স্বামীকে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছি।” তিনি আরও দাবি করেন, সেই পোস্টটি ছিল একটি রিটুইট, যা সাধারণ মিম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। কঙ্গনার কথায়, “মাহিন্দরের (মাতাজির স্বামী) সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছি। তখন দেশজুড়ে অনেকে প্রতিবাদ করছিলেন, এবং কেউ একজন ওই মিমে কমেন্ট করেছিলেন। সেই কারণেই ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমি দুঃখপ্রকাশ করেছি।” কিন্তু বিতর্ক যেন কঙ্গনার পিছু ছাড়ে না। ক্ষমা চাওয়ার পরও একের পর এক মন্তব্যে সমালোচনার তীর আবারও তাঁর দিকেই নিশানা করেছে। আর এবার কন্যাসন্তান নিয়ে তাঁর বক্তব্য যে কতটা সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত, তা বোঝাই যাচ্ছে সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া দেখে। অনেকেই বলছেন, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন সাংসদের এ ধরনের মন্তব্য বরং পিছিয়ে দেওয়া মানসিকতার প্রসার ঘটায়।
আধুনিক ভারতীয় সমাজে যেখানে মেয়েরা ডাক্তার, সেনা অফিসার, পাইলট, অ্যাথলিট, বিজ্ঞানী, সবক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে, সেখানে কঙ্গনার মন্তব্য আরও বেশি অস্বস্তিকর। কারণ তিনি বলিউড ও রাজনৈতিক জগতের প্রভাবশালী মুখ। তাঁর কথার প্রভাব পড়তে পারে অনেকের উপর। সমাজকর্মীদের মতে, কন্যাসন্তান নিয়ে পিছিয়ে থাকা মানসিকতা দূর করার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, ইতিবাচক প্রচার ও নারীশক্তিকে উৎসাহিত করা। সেখানে একজন সাংসদের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য হতাশাজনক।
বিতর্কের মাঝেই কঙ্গনার নিন্দা করেছেন সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রিটিরাও। কেউ কেউ বলছেন, কঙ্গনার টোনটাই এমন যে তিনি সবকিছু নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেন, আর সেটাই তাঁকে বারবার বিতর্কের মুখে দাঁড় করায়। আবার কেউ দাবি করেছেন, “এত প্রতিভাবান একজন অভিনেত্রীর কাছ থেকে আজও যদি কন্যাসন্তান নিয়ে এমন মন্তব্য আসে, তাহলে সমাজ এগোবে কীভাবে?” যদিও কঙ্গনা নিজে আর কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি, তবে তাঁর এই মন্তব্য বলিউড ও রাজনৈতিক মহলে যে নতুন করে আলোচনার আগুন ধরিয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিতর্ক কমার কোনও লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে সমাজ যত এগোচ্ছে, ঠিক ততবারই এমন মন্তব্যই যেন মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে, ভারত কি সত্যিই মানসিকতায় প্রগতিশীল হতে পেরেছে?
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ ষষ্ঠ কিস্তি)




