সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ, ১২ নভেম্বর ২০২৫: দিল্লির ভয়াবহ লালকেল্লা সন্নিকটে বিস্ফোরণের রেশ এখনও কাটেনি, আর তারই ছায়া যেন পড়ছে বাংলার মাটিতে। বুধবার সকালে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার ডোমকল (Domkal), গুড়িয়া (Guria) এবং সালার (Salar) এলাকায় টানা তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হল আরও ৮০টি শক্তিশালী বোমা। ইতিমধ্যেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ধার হওয়া বোমার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩০-এ, যা প্রশাসনের উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
জেলা পুলিশের বিশেষ টিম গতরাত থেকেই ইন্টেলিজেন্স-ভিত্তিক অভিযানে নামে। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার সকালে একাধিক গ্রামে শুরু হয় তল্লাশি। একের পর এক বাড়ি ও পরিত্যক্ত ঘর থেকে উদ্ধার হয় দেশি হাতবোমা, টাইমার সংযুক্ত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED), এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ। পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, “যেভাবে ধারাবাহিকভাবে গ্রামীণ এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা উদ্ধার হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট, একটি বড়সড় নাশকতার ছক তৈরি হচ্ছিল। যদি সময়মতো অভিযান না চালানো হতো, পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত।”
ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার হওয়া বোমাগুলি নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বোমাগুলির গঠন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। সন্দেহ করা হচ্ছে, এগুলি নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, গত কয়েক মাসে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন গ্রামে ‘স্লিপার সেল’-এর মতো ছোট ছোট নাশকতা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই চক্রগুলির সঙ্গে যুক্ত কিছু যুবক নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে রাজ্যের বাইরে থাকা অপরাধচক্রের সঙ্গে। পুলিশ এখন খুঁজে দেখছে, বোমা তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এই চক্রকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছে।
একজন সিনিয়র অফিসার (Senior Officer) বলেন, “এটি নিছকই স্থানীয় বিবাদ নয়, এর পেছনে বড় কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দিল্লির বিস্ফোরণের পর সারা দেশেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে বাংলায় ধারাবাহিক বিস্ফোরক উদ্ধার নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।” উল্লেখ্য, অভিযানে পাওয়া বিস্ফোরকের পরিমাণ দেখে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও চোখ কপালে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই বিস্ফোরকগুলি সম্ভবত সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে পাচার হচ্ছিল। মুর্শিদাবাদ বাংলাদেশ (Bangladesh) সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায়, এখানে চোরাচালান ও বেআইনি পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের আশঙ্কা বরাবরই থাকে। রাজ্য গোয়েন্দা দফতর ইতিমধ্যেই সীমান্তবর্তী থানাগুলিকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
স্থানীয় মানুষ এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ডোমকলের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এসব শুধু টেলিভিশনে দেখি, কিন্তু এখন নিজের এলাকায় এসব ঘটছে দেখে ভয় লাগছে। পুলিশ সময়মতো না এলে বড় বিপদ হতে পারত।” পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া বোমাগুলি রাখা হয়েছিল কিছু পরিত্যক্ত ঘর ও গুদামে, যেখান থেকে রাতের অন্ধকারে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একজন সরকারি মুখপাত্র (Government Spokesperson) বলেন, “বাংলার মাটিতে কোনোভাবেই নাশকতার জায়গা নেই। যারা শান্তি ও নিরাপত্তা নষ্ট করতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণের (Red Fort Blast) মতোই এই বোমা উদ্ধারও এক বড় নাশকতা পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, “দিল্লির ঘটনার পর বিভিন্ন রাজ্যে জঙ্গি ও নাশকতা মডিউল সক্রিয় হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা সেই চেইনের অংশ হতে পারে।”
বর্তমানে গোটা জেলা জুড়ে চলছে টহলদারি। বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়া এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও বিশেষ টাস্কফোর্স। জেলা প্রশাসন স্থানীয় মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে, এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলেই পুলিশকে জানাতে বলেছে। ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। যদিও সরকার বলছে, প্রশাসন সতর্ক ও সক্রিয়, তাই বড়সড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ এক ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে, রাজধানীর ছায়া কি সত্যিই বাংলায় পড়তে শুরু করেছে? সীমান্ত, চোরাচালান, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, সব মিলে রাজ্যের নিরাপত্তা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। প্রসঙ্গত, যেখানে রাজধানী আতঙ্কে কাঁপছে, সেখানে বাংলার গ্রামাঞ্চলেও নাশকতার ছায়া। এ যেন ভারতের অখণ্ড নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক গভীর সতর্ক সংকেত।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




