তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : মানব সভ্যতার দৃষ্টি আবারও মঙ্গলের দিকে। নীল আকাশ ভেদ করে লাল গ্রহের পথে রওনা দিচ্ছে নাসার (NASA) নতুন মিশন ESCAPADE- পুরো নাম Escape and Plasma Acceleration and Dynamics Explorers. আর এই ঐতিহাসিক যাত্রার বাহন হচ্ছে ব্লু অরিজিনের (Blue Origin) বিশালাকার নিউ গ্লেন (New Glenn) রকেট। আগামী ৯ নভেম্বর ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন (Cape Canaveral Space Force Station) থেকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকেল ২:৪৫ মিনিটে (স্থানীয় সময়) শুরু হবে উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া।
এই উৎক্ষেপণ শুধু একটি মহাকাশ মিশন নয়, তা মানবজাতির ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের দিকনির্দেশক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এটি হবে নিউ গ্লেন রকেটের দ্বিতীয় উড়ান, একটি আংশিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিশাল রকেট, যা তৈরির মাধ্যমে ব্লু অরিজিনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস (Jeff Bezos) আবারও প্রমাণ করছেন বেসরকারি মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ কতটা সম্ভাবনাময়।
এই অভিযানে দু’টি সমান মহাকাশযান একসঙ্গে পাড়ি দেবে নাম ব্লু(Blue) ও গোল্ড (Gold)। নাম দু’টি এসেছে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের (University of California, Berkeley) স্কুলের রঙ থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ই নাসার হয়ে পুরো মিশনটি পরিচালনা করবে। দু’টি মহাকাশযান নির্মাণ করেছে রকেট ল্যাব (Rocket Lab), যা বর্তমানে ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংস্থা। মঙ্গল অভিযানের ইতিহাসে ESCAPADE -ই হবে প্রথম মিশন যা একসঙ্গে দু’টি কক্ষপথে ঘুরে মঙ্গলের উপরের বায়ুমণ্ডল, আয়নোস্ফিয়ার ও চৌম্বক ক্ষেত্রের ত্রি-মাত্রিক (3D) মানচিত্র তৈরি করবে। এই যুগল মহাকাশযানগুলি মূলত পর্যবেক্ষণ করবে মঙ্গলের নিকটবর্তী মহাকাশের পরিবর্তনশীল পরিবেশ, সূর্যের প্লাজমা প্রভাব এবং বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয়ের প্রক্রিয়া। ইউসি বার্কলে (UC Berkeley) জানিয়েছে, “ESCAPADE মিশনের প্রধান লক্ষ্য হল মঙ্গলের উপরের বায়ুমণ্ডলের প্লাজমা ডায়নামিক্স বুঝে বের করা এবং সেই সঙ্গে চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনশীলতার কারণে কীভাবে মঙ্গল তার বায়ুমণ্ডল হারিয়েছে, তা নির্ণয় করা।”
পৃথিবী থেকে লাল গ্রহের পথে দীর্ঘ ভ্রমণ
উৎক্ষেপণের পর নিউ গ্লেন রকেট ব্লু ও গোল্ডকে নিয়ে যাবে পৃথিবী-সূর্য ব্যবস্থার দ্বিতীয় লাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে (Earth-Sun Lagrange Point 2 বা L2), যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে একটি স্থিতিশীল মাধ্যাকর্ষণীয় অঞ্চল। সেখানে প্রায় এক বছর থাকবে দু’টি মহাকাশযান, পর্যবেক্ষণ করবে সূর্যের প্লাজমা প্রবাহ ও মহাকাশের বিকিরণ প্রভাব। তারপর ২০২৬ সালের নভেম্বরে তারা পৃথিবীর কাছ দিয়ে একবার ঘুরে আসবে, যাতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে আরও গতি অর্জন করতে পারে। সেই সময়ই তারা মঙ্গলের পথে রওনা দেবে, এই জটিল পথকে বলা হয় গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট ট্রাজেক্টরি। কারণ পৃথিবী ও মঙ্গলের উপযুক্ত অবস্থান মাত্র প্রতি ২৬ মাস অন্তর একবার তৈরি হয়, তাই ২০২৬ সালের শেষ ভাগই তাদের জন্য উপযুক্ত সময়।
প্রায় ১০ মাসের যাত্রার পর ESCAPADE যুগল পৌঁছাবে লাল গ্রহের কক্ষপথে। এরপর প্রায় সাত মাস সময় লাগবে নিজেদের স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছাতে। তারপর শুরু হবে ডেটা সংগ্রহ, কমপক্ষে ১১ মাস ধরে চলবে সেই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। এই মিশন শুধু মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল বোঝার জন্য নয়, ভবিষ্যতের মানব বসতি স্থাপনের প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, “ESCAPADE-এর তথ্য আমাদের জানাবে কীভাবে মঙ্গল তার বায়ুমণ্ডল হারিয়েছে এবং আজ সেখানে বায়ুচাপ এত কম কেন। এটি ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর সময় বায়ুমণ্ডলীয় চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে সাহায্য করবে।”
উল্লেখ্য, মঙ্গলের চৌম্বক ক্ষেত্র এক সময় পৃথিবীর মতোই শক্তিশালী ছিল, কিন্তু কোটি কোটি বছর আগে তা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে সৌর বায়ু সরাসরি মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানতে শুরু করে, ধীরে ধীরে তার গ্যাসীয় স্তর ক্ষয়ে যায়। ESCAPADE মিশন এই পরিবর্তনশীলতার 3D মানচিত্র তৈরি করে দেখাবে কীভাবে সেই ক্ষয় এখনও চলছে।
নিউ গ্লেন- ব্লু অরিজিনের স্বপ্নের রকেট
ব্লু অরিজিনের এই নিউ গ্লেন রকেটকে অনেকেই আগামী প্রজন্মের মহাকাশ পরিবহনের ভিত্তি বলছেন। এটি প্রায় ৫০ টন পে-লোড (payload) কক্ষপথে বহন করতে সক্ষম, অর্থাৎ স্পেসএক্সের (SpaceX) ফ্যালকন হেভির (Falcon Heavy) সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপযুক্ত। নিউ গ্লেন প্রথম উড্ডয়ন করেছিল ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি। সেই উড্ডয়নে সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছেছিল ব্লু অরিজিনের ব্লু রিং (Blue Ring) প্রোটোটাইপ। তবে প্রথম ধাপের বুস্টারটি (booster) সমুদ্রের মাঝখানে ভাসমান জাহাজে সফলভাবে অবতরণ করতে পারেনি। ৯ নভেম্বরের উৎক্ষেপণে আবারও সেই ল্যান্ডিং প্রক্রিয়া পুনরায় চেষ্টা করা হবে, যা সফল হলে নিউ গ্লেনের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার পথ আরও সহজ হবে। জেফ বেজোস নিজে বলেছেন, “মানব সভ্যতা একদিন পৃথিবীর বাইরে বিস্তার লাভ করবে। নিউ গ্লেন সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি।” তাঁর এই বক্তব্যই যেন মিশনের সারমর্ম, এটি কেবল এক উৎক্ষেপণই নয়, এটি পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মানুষকে অন্য গ্রহে পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি ধাপ।
ইতিহাসের সাক্ষী হতে প্রস্তুত মহাকাশপ্রেমীরা
এই মিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে ব্লু অরিজিন। স্পেস ডট কম (Space.com) জানিয়েছে, তারা ও সরাসরি এই সম্প্রচার দেখাবে যদি সংস্থা ফিড উন্মুক্ত করে। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক প্রত্যক্ষ করবেন এই ঐতিহাসিক যাত্রা, যেখানে মানুষ ও যন্ত্র মিলে নতুন করে লিখবে মহাকাশ অভিযানের গল্প। আসলে এ যেন পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মানুষের অদম্য অনুসন্ধিৎসার আরেকটি নতুন অধ্যায়। ESCAPADE হয়ত মঙ্গলে মানুষের পা রাখার আগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে ফিরবে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Megan McArthur retirement, NASA astronaut Megan McArthur | মহাকাশ ইতিহাসে নতুন অধ্যায়: স্পেসএক্স ড্রাগন-এর প্রথম নারী পাইলট মেগান ম্যাকআর্থার অবসর নিলেন নাসা থেকে



