তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সাপ রহস্যে ঘেরা এক প্রাণী। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে কিংবা বর্ষার ভিজে মাটিতে তাদের দেখা পাওয়া যায় প্রায়ই, কিন্তু শীত নামলেই যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় এই সরীসৃপরা। প্রশ্ন জাগে, তারা কোথায় যায়? ঘুমিয়ে থাকে, নাকি সত্যিই মারা যায়? বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে এক অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হাইবারনেশন (Hibernation), অর্থাৎ শীতনিদ্রা। বিজ্ঞানীদের মতে, সাপের দেহে থাকে ঠান্ডা রক্ত (Cold-Blooded System)। অর্থাৎ, তারা নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পরিবেশের তাপমাত্রা কমে গেলে তাদের শরীরও ঠান্ডা হয়ে যায়, চলাফেরার গতি কমে আসে, এবং শক্তি ক্ষয় কমাতে তারা একপ্রকার গভীর নিদ্রায় প্রবেশ করে। শীতকালে এই অবস্থা স্থায়ী হয় প্রায় দুই থেকে তিন মাস বা কখনও আরও বেশি সময় ধরে।
শীতের শুরুতেই সাপেরা খুঁজে নেয় নিরাপদ আশ্রয়। সাধারণত তারা ঢুকে যায় মাটির গর্তে, পাথরের ফাঁকে, গাছের শেকড়ের নিচে কিংবা পরিত্যক্ত গুহায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সময় তাদের শরীরের ক্রিয়াকলাপ প্রায় থমকে যায়, হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, শ্বাস-প্রশ্বাস কমে যায়, এমনকি খাদ্য ও পানির প্রয়োজনও অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, “সাপ ঘুমোয় না, কারণ তাদের চোখ সবসময় খোলা থাকে।” কিন্তু আসলে সাপের চোখে চোখের পাতা নেই। তাদের চোখের উপর থাকে একটি স্বচ্ছ স্তর (Spectacle) যা চোখকে ধুলোবালি ও আঘাত থেকে রক্ষা করে। ফলে তারা ঘুমোলেও বাইরের দৃষ্টিতে মনে হয় যেন জেগে আছে। গবেষণা বলছে, সাপেরও মানুষের মতো ঘুমের চক্র আছে। ঘুমের সময় তারা প্রায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে এবং শব্দ বা আলোতেও খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

বছরের বিভিন্ন সময়ে সাপের আচরণ
গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরমে সাপেরা দিনের বেলায় ছায়ায় বা গর্তে আশ্রয় নেয়, কারণ সূর্যের তাপ তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তারা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে, শিকার করে এবং চলাফেরা করে। দিনে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা বিশ্রাম নেয় তারা। বর্ষাকালে পরিবেশে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, ফলে তাদের চলাচল ও খাদ্যগ্রহণ বেড়ে যায়। এই সময় মাঠে বা জঙ্গলে সাপের দেখা মেলে বেশি। শীতকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সাপদের বিপাকীয় প্রক্রিয়া (Metabolism) এতটাই ধীর হয়ে যায় যে তারা প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানী ড. অনিরুদ্ধ ঘোষ (Dr. Aniruddha Ghosh) বলেন, “সাপেরা শীতে মারা যায় না, তারা কেবল হাইবারনেশনে চলে যায়। এই সময় তাদের শরীর শক্তি সঞ্চয় করে রাখে, যা দিয়ে তারা শীতের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।” চমকপ্রদ বিষয় হল, অনেক সময় একাধিক সাপ একসঙ্গে একই গর্তে আশ্রয় নেয়। এর ফলে তারা একে অপরের শরীরের উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নেয়। এতে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে সুবিধা হয়। বসন্তের শুরুতে যখন তাপমাত্রা বাড়ে, তখন তারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, বেরিয়ে আসে শিকার ও প্রজননের জন্য। সাপ গড়ে দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা ঘুমোয়। তবে শীতের সময় এই সময়সীমা কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মরুভূমির কিছু প্রজাতি উল্টোভাবে গ্রীষ্মে অতিরিক্ত গরমে “অ্যাস্টিভেশন (Aestivation)” নামের গ্রীষ্মনিদ্রায় যায়। আরও এক আকর্ষণীয় বিষয় হল, সাপের ঘুমের সময় অনেক প্রজাতি ত্বক পরিবর্তন করে (Shedding)। এটি তাদের প্রাকৃতিক বৃদ্ধি ও সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি অংশ। ঘুম থেকে জেগে উঠতে তাদের কিছুটা সময় লাগে, কারণ এই সময় রক্ত চলাচল ও পেশির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ আঠেরো-তম কিস্তি)
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় , ৩০০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। শুধুমাত্র ভারতে আছে প্রায় ৬৯টি বিষাক্ত প্রজাতি, যার মধ্যে ৪০টি স্থলভাগে এবং ২৯টি সমুদ্রজলে বাস করে। কিং কোবরা (King Cobra), ক্রেইট (Krait), ব্ল্যাক মাম্বা (Black Mamba)এবং ভাইপার (Viper) হল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সাপদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপেরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তারা মাঠে ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে কৃষকদের সহায়তা করে। তাই শীতে তাদের “অদৃশ্য” হয়ে যাওয়া প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, মৃত্যুর নয়।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)




