তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : বলিউডে এখন ক্রমশ বাড়ছে নিরামিষাশীদের সংখ্যা। স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা কিংবা প্রাণপ্রেম, নানা কারণেই তারকারা আজকাল আমিষ খাবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। তবে অভিনেত্রী রবিনা ট্যান্ডন (Raveena Tandon)-এর গল্প একেবারেই অন্যরকম। কারণ, তাঁর নিরামিষ জীবনের শুরুটা কোনো ফিটনেস ট্রেনারের পরামর্শে নয়, বরং এক গভীর আবেগঘন মুহূর্তে। এক সাক্ষাৎকারে রবিনা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি মাছ, মাংস খেতে ভালোবাসতেন। তাঁর ডায়েটে নন-ভেজ পদ থাকা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এক ঘটনার পর তাঁর মন যেন আমূল বদলে যায়। সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রীর কণ্ঠে আজও কাঁপন শোনা যায়। রবিনা বলেন, “আমি একবার এক মন্দিরে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম দু’টি ভেড়াকে বলি দেওয়া হচ্ছে। তাদের চিৎকার, তাদের ভয়, তাদের চোখের জল, সব কিছু আমার মন কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। সেই মুহূর্তেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কখনও আমিষ খাব না।”

এই ঘটনাই তাঁকে জীবনের নতুন পথে নিয়ে আসে। সেই দিন থেকেই রবিনা ট্যান্ডন নিরামিষভোজী হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে মাংস, মাছ, ডিম, কোনও আমিষ পদই তাঁর পাতে ওঠেনি। নিজের সিদ্ধান্তে তিনি আজও অবিচল। রবিনা বলেন, “নিরামিষভোজনের সিদ্ধান্তটা কারও চাপে নয়, তা নিজের বিবেকের তাগিদে নিয়েছিলাম। কেউ যদি সত্যিই পরিবর্তন আনতে চায়, সেটা ভেতর থেকে আসতে হয়। বাইরের উপদেশে সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয় না।”
উল্লেখ্য, অভিনেত্রীর এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও লাইফ কোচ ডেলনা রাজেশ (Delna Rajesh) বলেন, “রবিনা ট্যান্ডনের গল্প শুধু তারকাদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষকেও ভাবতে শেখায়। আমরা অনেক সময় পরিবর্তনের জন্য বাইরের প্রভাব খুঁজি, কিন্তু আসল পরিবর্তন শুরু হয় ভেতর থেকে। রবিনার মতো মানুষরা প্রমাণ করেন, এক মুহূর্তের উপলব্ধিই কারও জীবনের ধারা পালটে দিতে পারে।”
পুষ্টিবিদদের মতে, নিরামিষভোজন এখন অনেকেই বেছে নিচ্ছেন কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে নয়, বরং স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও। শরীরে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ফ্যাট ও টক্সিন জমা রোধে ভেজিটেরিয়ান ডায়েট সহায়ক হতে পারে। তবে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আমিষ খাবার খেয়ে অভ্যস্ত, তাঁদের হঠাৎ নিরামিষে পরিবর্তন আনতে কিছুটা মানিয়ে নেওয়ার সময় লাগে। পুষ্টিবিদ রিতিকা বেরা বলেন, “যাঁরা হঠাৎ আমিষ থেকে নিরামিষে আসছেন, তাঁদের প্রোটিন ঘাটতির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। মাছ-মাংস না খেলে তার বিকল্প হিসেবে ডাল, টোফু, ছোলা, সয়া, বাদাম ও দুধজাত খাবার খেতে হবে। এই খাদ্যগুলো শরীরের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড ও পুষ্টি জোগায়।” রবিনা ট্যান্ডনের জীবনের এই পরিবর্তন শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস নয়, এক ধরনের মানসিক পরিশুদ্ধিরও প্রতীক। তাঁর এই সিদ্ধান্তে তিনি জীবজগতের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়েছেন বলেই জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা মানুষ হিসেবে প্রাণীদের থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারি, বিশেষ করে ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থতা। তাই আমি চেষ্টা করি আমার জীবনটা যতটা সম্ভব অহিংসা আর সহানুভূতির মধ্যে রাখতে।”
রবিনার এই পথ চলা আজকের যুগের এক শক্তিশালী বার্তা। যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন ডায়েট ট্রেন্ড, প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট কিংবা ওজন কমানোর ফর্মুলা ভেসে আসছে, সেখানে তাঁর সিদ্ধান্তটা একেবারে মন থেকে নেওয়া মানবিক পদক্ষেপ। রবিনা ট্যান্ডন এখন শুধুমাত্র নিরামিষভোজীই নন, তিনি পরিবেশ ও প্রাণিকল্যাণ সংক্রান্ত নানা প্রচারেও যুক্ত। পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একাধিকবার সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর ইনস্টাগ্রামেও প্রায়ই দেখা যায়, পশুদের নিয়ে সচেতনতার পোস্ট বা ভিডিও। তবে রবিনা বিশ্বাস করেন, পরিবর্তন কখনও জোর করে আনা যায় না। সেটা হতে হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফল। তাঁর ভাষায়, “আমাকে কেউ কখনও বলেনি আমিষ ছেড়ে দিতে। আমি নিজেই অনুভব করেছি যে, আমার খাওয়া মানে যদি আরেকটি প্রাণের কষ্ট হয়, তবে সেই আনন্দ আমার জীবনে শান্তি আনবে না।”
আজকের দিনে, যখন ফিটনেস মানেই প্রোটিনের নাম, তখন রবিনার মতো তারকারা প্রমাণ করছেন, সহানুভূতি ও নৈতিকতার মধ্যেও সুস্থ জীবনের ভারসাম্য সম্ভব। রবিনার সেই মন্দির দর্শনের মুহূর্তটি হয়তো তখন একটি ক্ষণিক অনুভূতি ছিল, কিন্তু সেটাই আজ তাঁর জীবনের দর্শন হয়ে উঠেছে। তাঁর গল্প আজও মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন শুরু হয় এক মুহূর্তের উপলব্ধি থেকে, যদি তা আসে অন্তর থেকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Ajay Devgn Alcohol Habit Change | অজয় দেবগন এখন রাতে মাত্র দু’পেগ মদ পান করেন




