শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ইউনেস্কোর (UNESCO) সৃজনশীল শহরের তালিকায় জায়গা করে নিল নবাবি ঐতিহ্যের শহর লখনউ (Lucknow)। ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো প্রকাশ করেছে বিশ্বের নতুন ৫৮টি শহরের নাম, যারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, শিল্প ও সৃজনশীলতায় অনন্য। এই তালিকায় লখনউকে দেওয়া হয়েছে ‘Creative City of Gastronomy’ অর্থাৎ সৃজনশীল খাদ্যসংস্কৃতির শহর হিসেবে স্বীকৃতি। এর মধ্য দিয়ে ভারতের দ্বিতীয় শহর হিসেবে এই সম্মান পেল লখনউ; এর আগে ২০১৯ সালে হায়দরাবাদ (Hyderabad) পেয়েছিল একই স্বীকৃতি। লখনউয়ের এই আন্তর্জাতিক সম্মান ভারতের রন্ধনশিল্প, ঐতিহ্য এবং বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও বিশ্বজয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়েছে, “লখনউয়ের রন্ধনশৈলী শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক। নবাবি ঐশ্বর্য, রাস্তার স্বাদ, এবং আওয়াধি খাবারের মিশ্রণে এই শহর সত্যিকারের এক গ্যাস্ট্রোনমিক হেরিটেজ।”
ভারতে ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি দলও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে, “এটি ভারতের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। লখনউয়ের খাবার কেবল রুচির নয়, সংস্কৃতির প্রতিফলন। এই স্বীকৃতি দেশের খাদ্য ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরল।” উল্লেখ্য, লখনউ মানেই রন্ধনশিল্পের ইতিহাস। রাস্তার ধারে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পুরনো গলির চাট, টুন্ডে কবাব (Tunday Kabab), নেহারি, কোরমা বা বিরিয়ানির মতো আওয়াধি খাবার, সবকিছুতেই লুকিয়ে আছে শতাব্দীর ঐতিহ্য। স্থানীয়রা বলেন, “এখানকার খাবারের মধ্যে আছে ভালোবাসা, ধৈর্য আর গর্ব। একেকটা পদ যেন একেকটা কবিতা।” বিশ্বজোড়া পরিচিত লখনউ চাট (Lucknow Chaat) বা শিরমাল (Sheermal) -এর মতো পদও এখন বিশ্বরসিকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। স্থানীয় রেস্তরাঁ মালিক আসিফ আলি (Asif Ali) বলেন, “আমরা অনেকদিন ধরেই চেয়েছিলাম লখনউকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কারণ এই শহরের রান্না শুধু রেসিপি নয়, এটি এক জীবনযাপন।”
লখনউয়ের এই নতুন পরিচয়ে গর্বিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “লখনউ মানেই প্রাণবন্ত সংস্কৃতি, যার কেন্দ্রে আছে অসাধারণ এক রন্ধন ঐতিহ্য। ইউনেস্কো যে লখনউয়ের এই রন্ধন সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি দিয়েছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আমি সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি, এই সুন্দর শহরের স্বাদ ও সংস্কৃতি উপভোগ করতে একবার ঘুরে যান।” প্রসঙ্গত, ইউনেস্কো ২০০৪ সালে শুরু করেছিল Creative Cities Network (UCCN) যেখানে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশের ৪০০-র বেশি শহর যুক্ত। এই বছর সৃজনশীলতার তালিকায় যুক্ত হয়েছে ৫৮টি নতুন শহর। লখনউ ছাড়াও “Creative City of Gastronomy” ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে পর্তুগালের Matosinhos
ও ইকুয়েডরের Cuenca। অন্যদিকে, সঙ্গীতের জন্য কেনিয়া Kisumu এবং অস্ট্রেলিয়ার New Orleans, ডিজাইনের জন্য সৌদি আরবের Riyadh, চলচ্চিত্রের জন্য মিশরের Giza, এবং স্থাপত্যের জন্য ফিনল্যান্ডের Rovaniemi পেয়েছে সৃজনশীল শহরের তকমা।
ইউনেস্কোর প্রধান পরিচালক অড্রে আজুলে (Audrey Azoulay) বলেন, “প্রতিটি শহরই তাদের নিজস্ব সৃজনশীল শক্তিকে উদযাপন করছে। এই শহরগুলো টেকসই উন্নয়ন, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মাধ্যমে একে অপরকে অনুপ্রাণিত করবে।” অন্যদিকে, ভারতের হায়দরাবাদের পর লখনউয়ের নাম এই তালিকায় যোগ হওয়ায় দেশের রন্ধনশিল্প আরও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বীকৃতি ভারতীয় গ্যাস্ট্রোনমি পর্যটনকেও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পর্যটন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছরে “Taste of Lucknow” নামে এক আন্তর্জাতিক ফুড ফেস্টিভ্যাল আয়োজনের পরিকল্পনাও চলছে।লখনউয়ের বাসিন্দা ও ফুড ব্লগার সোনম খান (Sonam Khan) বলেন, “এই শহরের প্রতিটি গলি যেন এক একটি স্বাদের স্মৃতি। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি শুধু আমাদের নয়, প্রত্যেক রাঁধুনির, যিনি প্রতিদিন নিজের হাতে ইতিহাস রাঁধেন।” এই স্বীকৃতি নবাবি ঐতিহ্যের শহর লখনউকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন আলোয় উজ্জ্বল করেছে। যেখানে এক থালায় ইতিহাস, ভালোবাসা, সংস্কৃতি এবং কাব্যিক স্বাদ মিলেমিশে একাকার, সেই লখনউ আজ বিশ্বের সামনে ‘Creative City of Gastronomy’ হিসেবে নিজের আসন গেঁড়ে বসেছে গর্বভরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Pratika Rawal ICC, Pratika Rawal no medal | ৩০৮ রান করেও মেডেলহীন! প্রতীকা রাওয়ালকে ঘিরে প্রশ্নে সরগরম ক্রিকেট দুনিয়া




