মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : তিনি ছিলেন ভারতের মহিলাদের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম স্থপতি। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে দলের জন্য একের পর এক ম্যাচ জেতানো ইনিংস। কিন্তু বিশ্বজয়ের আনন্দের মুহূর্তেও তাঁর মুখে নেই হাসি, হাতে নেই মেডেল। কারণ, নিয়মই তাঁকে বঞ্চিত করেছে। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে প্রতীকা রাওয়াল (Pratika Rawal)-এর। তিনি গোটা টুর্নামেন্টে ৩০৮ রান করে ভারতের ব্যাটিং স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু ফাইনালে মাঠে না নামায় মেডেল থেকে বঞ্চিত হলেন।মাত্র ২৫ বছর বয়সেই প্রতীকা হয়ে উঠেছিলেন ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ওপেনারদের একজন।

স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana) সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সফল ওপেনিং জুটিগুলির একটি। পাওয়ারপ্লেতে আগ্রাসী ব্যাটিং, পাশাপাশি লং হিটে দক্ষতা। সব মিলিয়ে ভারতকে একাধিক ম্যাচে জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রতীকা। টুর্নামেন্টে তাঁর গড় ৫১.৩৩, স্ট্রাইক রেট ১৩০-এর কাছাকাছি। তাঁর সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ১২২, যা ছিল একদম ক্লাসিক ইনিংস, টেকনিক আর ধৈর্যের নিখুঁত মিশেল। কিন্তু ভাগ্য কখনও কখনও সবচেয়ে পরিশ্রমী খেলোয়াড়কেও অবিচার করে। সেমিফাইনালের আগেই গুরুতর হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে আক্রান্ত হন প্রতীকা। দলের মেডিক্যাল টিম জানিয়েছিল, তাঁর পক্ষে বাকি ম্যাচে ফিল্ডিং বা ব্যাটিং সম্ভব নয়। শেষমেশ তাঁকে বাদ দিয়ে স্কোয়াডে জায়গা দেওয়া হয় শেফালি বর্মাকে (Shafali Verma)। সেই জায়গাতেই যেন ক্রিকেট ঈশ্বর এক অদ্ভুত গল্প লিখলেন, কারণ ফাইনালে শেফালি খেললেন ৭৮ বলে ৮৭ রানের ম্যাচ-জেতানো ইনিংস, সঙ্গে বল হাতে নিলেন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। তাঁকেই ঘোষিত করা হয় ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়। তবে টুর্নামেন্ট শেষে যখন ভারতীয় দলের হাতে উঠল বিশ্বকাপ ট্রফি, তখন হুইলচেয়ারে বসা প্রতীকা হাততালি দিয়ে সহ-খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানালেও, তাঁর মুখে দেখা গিয়েছে এক গভীর নীরবতা। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) নিয়ম অনুযায়ী, কেবলমাত্র ১৫ জনের অফিসিয়াল স্কোয়াড সদস্যরাই বিজয়ীর মেডেল পান। প্রতীকা শুরুতে সেই ১৫ জনের মধ্যে ছিলেন বটে, কিন্তু ইনজুরির পর রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে শেফালি আসায় তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ যায়। ফলে নিয়মত মেডেল দেওয়া সম্ভব নয়।

এই নিয়ম নিয়েই এখন সরগরম ক্রিকেট দুনিয়া। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, “যিনি দলের বিশ্বজয়ের পথে এত বড় অবদান রেখেছেন, তিনিও যদি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা কতটা ন্যায্য?” প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার এবং ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মানজরেকার (Sanjay Manjrekar) টুইট করে লিখেছেন, “আইসিসি-র উচিত এই নিয়ম পুনর্বিবেচনা করা। একজন ক্রিকেটার গোটা টুর্নামেন্টে দেশের জন্য রক্ত-ঘাম ঝরালেন, অথচ ফাইনালে না খেললে তাঁর কোনও স্বীকৃতি থাকবে না, এটা খুবই অমানবিক।”
প্রতীকার পরিবার থেকেও হতাশার সুর শোনা গিয়েছে। তাঁর বাবা রাজীব রাওয়াল (Rajiv Rawal) এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রতীকা দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছিল ছোটবেলা থেকে। এবার যখন ওর পারফরম্যান্সে দেশ জিতল, তখনও ও মেডেল পাবে না, এটা আমাদের ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।” অবশ্য ইতিহাসে এরকম ঘটনা নতুন নয়। ২০০৩ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার পেসার জেসন গিলেস্পি (Jason Gillespie) চারটি ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়েও চোটের কারণে ছিটকে গিয়েছিলেন। তাঁর জায়গায় আসেন নাথান ব্র্যাকেন (Nathan Bracken), এবং অস্ট্রেলিয়া জিতলেও গিলেস্পি পাননি বিজয়ীর মেডেল। ইতিহাস যেন প্রতীকাকে নিয়েও সেই একই গল্প পুনরাবৃত্তি করল।

ভারতীয় দলের অমল মজুমদার অবশ্য প্রতীকার অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ম্যাচের পর সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “এই দলের প্রতিটি জয় প্রতীকার। আমরা জানি, সে মাঠে না থাকলেও দলের এক বড় অংশ ছিল। ওর ইনিংসগুলো ছাড়া আমরা ফাইনালে পৌঁছতেই পারতাম না।” প্রতীকা নিজে অবশ্য কোনও ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। বরং ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেছেন, সেখানে তিনি হুইলচেয়ারে বসে, হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে হালকা হাসি। ক্যাপশন দিয়েছেন, “Medal or no medal, this victory is ours!” তাঁর এই সংযমী প্রতিক্রিয়াই যেন প্রমাণ করে দিল, সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নরা ট্রফিতে নয়, মানসিকতায় তৈরি হয়। তবে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভবিষ্যতে আইসিসি যেন নিয়মে পরিবর্তন আনে, যাতে যারা টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে দলের সাফল্যে ভূমিকা রাখেন, তাঁরা ফাইনালে না খেললেও প্রাপ্য স্বীকৃতি পান। উল্লেখ্য, প্রতীকা রাওয়াল হয়ত মেডেল পাননি, কিন্তু কোটি ভারতীয়র হৃদয়ে তিনি ইতিমধ্যেই এক সোনার ট্রফি জিতে নিয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amol Muzumdar Women’s World Cup | ব্যাট হাতে স্বপ্ন অপূর্ণ, কিন্তু কোচ হিসেবে পূর্ণতা!দ্রোণাচার্য অমল মজুমদার



