সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বুসান, দক্ষিণ কোরিয়া: বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও উঠে এল চিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ঘিরে কার্যত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেই মুখোমুখি বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। ২০১৯ সালের পর দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার এই সাক্ষাৎকে ঐতিহাসিক বলছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আর বৈঠক শেষে ট্রাম্পের ঘোষণাই যেন বদলে দিল দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, “এই মিটিংটা অসাধারণ হয়েছে। এক কথায় দারুণ!” তাঁর ভাষায়, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জট অবশেষে কিছুটা হলেও খুলতে শুরু করেছে। বাণিজ্য, খনিজ সম্পদ, ফেন্টানাইল (Fentanyl) উৎপাদন রোধ, এবং কৃষি আমদানি-রফতানিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে তাঁদের মধ্যে। ট্রাম্পের দাবি, “আমি এই বৈঠককে ১ থেকে ১০-এর মধ্যে ১২ দেব! এতটাই ফলপ্রসূ আলোচনাই হয়েছে।” যদিও সবকিছু প্রকাশ্যে আনতে চাননি তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “সব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে তা বলব না, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। শীঘ্রই সেগুলি জানানো হবে।”
শুল্ক হ্রাসে বড় ঘোষণা
ট্রাম্প বৈঠক শেষে ঘোষণা করেন, চিনা পণ্যের উপর ধার্য শুল্ক ৫৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৭ শতাংশ করা হবে। এই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈঠকে উপস্থিত মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, “এই সিদ্ধান্ত শুধু মার্কিন অর্থনীতির জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
বিরল খনিজ রফতানিতে নতুন চুক্তি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে বিরল খনিজ (Rare Earth Minerals) নিয়ে দ্বন্দ্বই হয়ে উঠেছিল প্রধান অচলাবস্থা। বেজিং সম্প্রতি বিরল খনিজ রফতানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যার ফলে মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দাবি, “বিরল খনিজ সমস্যার সমাধান হয়েছে। আমেরিকায় এর রফতানিতে আর কোনও বাধা থাকবে না।”
এক মার্কিন প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, বিরল খনিজ নিয়ে চিন ও আমেরিকার মধ্যে এক বছরের জন্য নতুন চুক্তি হয়েছে। অর্থাৎ, আগামী এক বছর বিরল খনিজের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
কৃষকদের স্বস্তি: সয়াবিন চুক্তি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বৈঠকের আরেকটি বড় দিক তুলে ধরে বলেন, “চিন অবিলম্বে আবার আমেরিকান সয়াবিন কেনা শুরু করবে। এটি আমাদের কৃষকদের জন্য একটি বড় বিজয়।” অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৮ সালের ট্রেড ওয়ার-এর সময় যে সয়াবিন রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আবার সচল হওয়া মার্কিন কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় আশার খবর।
ফেন্টানাইল বন্ধে আশ্বাস
ফেন্টানাইল, একটি মারাত্মক কৃত্রিম মাদক, মার্কিন সমাজে বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, “জিনপিং আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চিন ফেন্টানাইল উৎপাদন ও পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।” মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ জানাচ্ছিল, চিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ফেন্টানাইল পাচার হচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতেই এই প্রতিশ্রুতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তাইওয়ান প্রসঙ্গ তুললেন না ট্রাম্প
তাইওয়ান (Taiwan) ইস্যু নিয়ে যে উত্তেজনা বহু বছর ধরেই চলছে, তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই বৈঠকে ট্রাম্প পরিষ্কার করে জানান, তাইওয়ান প্রসঙ্গ ওঠেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক সমাধান খোঁজা, তাইওয়ান নিয়ে বিতর্ক বাড়ানো নয়।” প্রসঙ্গত, প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প তাইওয়ানকে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যা বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় তৈরি করেছিল।
চিন সফরে যাচ্ছেন ট্রাম্প
ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আগামী বছরের এপ্রিলে তিনি চিন সফরে যাবেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা নতুন সূচনার পথে হাঁটছি। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মানই দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি হবে।” বেজিং সূত্রে জানা গিয়েছে, জিনপিং-ও পরবর্তী সময়ে আমেরিকা সফর করবেন। চিন প্রশাসনের বিবৃতি অনুযায়ী, “দুই দেশের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির দিকে আরও জোর দেওয়া হবে।” অন্যদিকে, বিশ্বরাজনীতিতে এই বৈঠকের তাৎপর্য অনস্বীকার্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), রাশিয়া (Russia), এবং জাপান (Japan) ইতিমধ্যেই এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে নজর রাখছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই সমঝোতা বাস্তবে রূপ নেয়, তবে বৈশ্বিক বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। উল্লেখ্য যে, বৈঠক শেষে ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যই যেন সেই পরিবর্তনের পূর্বাভাস, “চিন এবং আমেরিকার সম্পর্ক এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। আমরা একে অপরকে হারাতে নয়, এগিয়ে নিতে চাই।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gaza ceasefire warning, Donald Trump Hamas warning | ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি: ‘শুধরে না গেলে হামাসকে সমূলে নির্মূল করা হবে’ শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত!




