সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেইজিং : পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন উষ্ণতা তৈরি করেছে বেইজিং ও টোকিওর সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বার্তা। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi) মঙ্গলবার জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi)-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং বলেন, “চীন-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের বিনিময় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” এই মন্তব্য থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত এবারের এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (APEC) সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তাকাইচির মধ্যে সরাসরি সাক্ষাৎ হতে পারে। উল্লেখ্য, দু’জনই এই সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য এপেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন, যা দুই প্রতিবেশী শক্তির মধ্যে বরফ গলানোর এক ‘নিউট্রাল গ্রাউন্ড’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চীনের কূটনীতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন, এই সাক্ষাৎ কি দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা উত্তেজনা কমানোর নতুন দিগন্ত খুলে দেবে? ওয়াং ই বলেন, “জাপানের নতুন মন্ত্রিসভা থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক সংকেত চীন লক্ষ্য করেছে।” তবে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। বেইজিং গত শুক্রবার ঘোষণা করেছিল যে, শি জিনপিং এবারের এপেক সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং (Lee Jae Myung) সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবারের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না বলে সূত্রের খবর। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন জাপানি প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির নীতিগুলো চীনের দৃষ্টিতে কিছুটা উদ্বেগজনক হতে পারে। তিনি বরাবরই চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে সওয়াল করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন তাকাইচি
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহেই তাকাইচি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ট্রাম্প তাঁর সামরিক উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রশংসা করে বলেন, “জাপান আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতি অপরিহার্য।” দুই দেশের মধ্যে ওই বৈঠকে বাণিজ্য ও বিরল খনিজ (rare earths) সম্পদ বিনিময় নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। চীন অবশ্য এই জাপান-মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের মতে, এমন সামরিক জোট পূর্ব এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে পেরুর লিমা শহরে অনুষ্ঠিত এপেক সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা (Shigeru Ishiba) -এর একটি সীমিত বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় সম্পর্কের কোনও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু, এবারের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। তাকাইচি সম্প্রতি পার্লামেন্টে অনুমোদন পেয়েছেন জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তবে তিনি বিতর্কিত ইয়াসুকুনি মন্দিরের (Yasukuni Shrine) নিয়মিত দর্শনার্থী, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কিছু সেনানায়ককেও শ্রদ্ধা জানানো হয়। এই কারণে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, “আমি আশা করি জাপানের নতুন মন্ত্রিসভা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রথম পদক্ষেপটি সঠিকভাবে নেবে। সম্পর্কের প্রথম বোতামটি যদি ঠিকভাবে আটকানো যায়, তাহলে বাকিটা মসৃণভাবে এগোবে।” তাঁর এই মন্তব্যে আশার সুর যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সতর্কতার ছায়াও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক লি হানচুয়ান বলেন, “চীন ও জাপান উভয়েই জানে, তাদের সম্পর্ক যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে তার ফল ভুগবে পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনীতি।” অন্যদিকে, টোকিও ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়াসুহিরো কিমুরা (Yasuhiro Kimura) মনে করেন, “তাকাইচি একদিকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক, অন্যদিকে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক কূটনীতিও তিনি বুঝতে পারেন। যদি দু’দেশের নেতারা ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ করেন, তবে তা কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে।” উল্লেখ্য, চীন বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সামরিক সহযোগিতাকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। বেইজিংয়ের মতে, জাপানে মার্কিন সেনা ঘাঁটি থাকা “তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের ওপর কৌশলগত চাপ” তৈরি করে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বেইজিং ও টোকিও উভয়েই বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে আলোচনায় আগ্রহী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যদি শি জিনপিং ও তাকাইচির বৈঠক সত্যিই অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নয়, গোটা এশিয়ার কূটনৈতিক দিকপালদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)



