সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নয়াদিল্লি, ২৮ অক্টোবর : দূষণের কালো পর্দায় ঢেকে থাকা ভারতের রাজধানী দিল্লি এবার আশার আলো দেখছে আকাশের দিকেই। প্রথমবারের মতো শহরটির বায়ুদূষণ কমাতে শুরু হলো ক্লাউড সিডিং বা কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টির পরীক্ষা। এই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়, এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, কানপুর (IIT-Kanpur)। দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী মানজিন্দর সিং সিরসা (Manjinder Singh Sirsa) মঙ্গলবার জানান, “আমরা মেঘে বিশেষ রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করছি যা জলকণার সৃষ্টি করে বৃষ্টি ঘটাতে সাহায্য করে। আশা করা হচ্ছে ১৫ মিনিট থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “যদি এই পরীক্ষামূলক প্রয়াস সফল হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।”
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য, বায়ুতে জমে থাকা ধুলিকণা, ধোঁয়া, এবং বিষাক্ত কণাকে বৃষ্টির মাধ্যমে নিচে নামিয়ে আনা, যাতে নাগরিকদের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা কিছুটা হলেও কমে। দিল্লি এবং এর আশপাশের এলাকা প্রতি বছর শীতকালে ভয়াবহ দূষণের শিকার হয়, যখন ঠান্ডা ভারী বায়ু নির্মাণস্থলের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, এবং কৃষিক্ষেতের পোড়া ফসলের ধোঁয়াকে আটকে ফেলে।

মঙ্গলবার দুপুরে শহরের সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (CPCB) জানিয়েছে, দিল্লির এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) দাঁড়িয়েছে ৩০৪ যা ‘খুবই খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত। ০ থেকে ৫০ পর্যন্ত সূচক ‘ভাল’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে শহরটির বায়ু কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কানপুর আইআইটির বিজ্ঞানী মনিন্দ্র আগরওয়াল (Manindra Agrawal) বলেন, “ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টি ঘটলে দূষণের মাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তবে এর প্রভাব স্থায়ী নয়, কারণ দূষণের উৎস এখনও রয়ে গেছে। তাই মেঘের উপস্থিতি থাকলেই প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করতে হবে।”
অন্যদিকে, আইআইটি-কানপুরের শেয়ার করা ছবিতে দেখা গিয়েছে, আকাশে উড়ন্ত একটি বিমানের ডানায় সংযুক্ত ফ্লেয়ার থেকে রাসায়নিক নির্গত হচ্ছে, যা মেঘে প্রবেশ করে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। এই পদ্ধতিতে মূলত সিলভার আয়োডাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মেঘে জলকণার ঘনীভবন বাড়ায়। উল্লেখ্য, বিশ্বের বহু দেশ অতীতে খরার সময় ফসল বাঁচাতে কিংবা বায়ু পরিষ্কার করতে ক্লাউড সিডিংয়ের ব্যবহার করেছে। কিন্তু ভারতের রাজধানীতে এটি প্রথম প্রয়াস। যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানমহলে দ্বিধা রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জলবায়ুগত অনিশ্চয়তা ও বাতাসের আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে সবসময়ই সফলতা নিশ্চিত নয়। তবুও দিল্লি প্রশাসনের আশাবাদী, যদি পরীক্ষাটি ফলপ্রসূ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। সিরসা বলেন, “আমরা চাই এই প্রযুক্তি দিল্লিকে ‘স্মার্ট ও রেসপিরেবল সিটি’-তে রূপান্তর করুক। মানুষ যেন প্রতিদিন ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ না দেখে।”
গত সপ্তাহ থেকেই দিল্লির আকাশে সূর্য দেখা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। দূষণের ধোঁয়ায় সকাল ও রাত একাকার হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই মাস্ক ছাড়া বাইরে বের হতে পারছেন না। হাসপাতালে ফুসফুসজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, স্কুলের আঙিনায় শিশুদের খেলা বন্ধ হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনেক নাগরিকের কাছে “শেষ আশার কিরণ” বলে মনে হচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু কৃত্রিম বৃষ্টি নয়, দূষণের মূল উৎস, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণস্থলের ধুলা, এবং কৃষিজমির আগুন, এসব নিয়ন্ত্রণ করাই আসল সমাধান। তবু তারা এটিকে একটি ‘প্রয়োগযোগ্য বিকল্প’ হিসেবে দেখছেন।আইআইটি-কানপুর জানিয়েছে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে রাজধানীর আকাশে প্রাকৃতিক বৃষ্টির প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিকভাবে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা চলছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ২টি বিমান প্রস্তুত রেখেছে, যা নির্দিষ্ট মেঘের ঘনত্ব ও আর্দ্রতার পরিমাপ করে রাসায়নিক নিঃসরণ করছে। বিজ্ঞানীদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দৃশ্যমান ফল পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে দিল্লির সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি শুধুই ‘অস্থায়ী সমাধান’? দক্ষিণ দিল্লির বাসিন্দা রাজীব মেহতা বলেন, “বৃষ্টি হলে দূষণ সাময়িকভাবে কমে, কিন্তু মূল কারণ তো থেকেই যায়। তবু সরকারের এই প্রচেষ্টা সাহসী পদক্ষেপ।”
পরিবেশবিদদের মতে, দিল্লির মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও দূষণপ্রবণ শহরে টেকসই সমাধানের জন্য দরকার সমন্বিত নীতি, যেখানে শিল্প নির্গমন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি প্রথার আধুনিকীকরণ একসঙ্গে কাজ করবে। তবুও বলা যায়, দিল্লির আকাশে এই ‘বৈজ্ঞানিক বীজ বপন’ ভারতের পরিবেশ নীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। হয়তো এই প্রথমবার শহরের মানুষরা সত্যিই চাইছে, আকাশটা একটু ভিজে যাক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)




