পার্বতী কাশ্যপ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : নতুন বছরের আগে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের মুখে সুখবরের বার্তা। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিল অষ্টম বেতন কমিশনের (8th Pay Commission) শর্তাবলি বা ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, “মন্ত্রিসভা অষ্টম বেতন কমিশনের টার্মস অফ রেফারেন্স অনুমোদন করেছে। কমিশন ১৮ মাসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।”
এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে বাস্তব রূপ দিল। ২০১৬ সালে সপ্তম বেতন কমিশন (7th Pay Commission) কার্যকর হওয়ার পর থেকেই নতুন কমিশনের দাবি জোরালো হচ্ছিল। সপ্তম বেতন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সেই সূত্রেই ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশকৃত নতুন বেতন কাঠামো। অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই (Justice Ranjana Prakash Desai) -এর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে তিন সদস্যের কমিশন। কমিশনের অপর দুই সদস্য পুলক ঘোষ (Pulak Ghosh) এবং পঙ্কজ জৈন (Pankaj Jain)। জানা গিয়েছে, কমিশন মূল বেতন, গ্রেড পে, ভাতা এবং পেনশন কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করতে পারে। এই সুপারিশগুলি সরকারের কাছে আগামী দেড় বছরের মধ্যেই জমা পড়বে। অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, “বিভিন্ন মন্ত্রক, রাজ্য সরকার, কর্মী সংগঠন এবং যৌথ পরামর্শদাতা সংস্থার সঙ্গে বিশদ আলোচনার পরেই ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’ নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য, একটি আরও কার্যকর, ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো তৈরি করা, যা আধুনিক ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে মানানসই।”
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫০ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী এবং ৬৯ লক্ষ পেনশনভোগী সরাসরি অষ্টম বেতন কমিশনের প্রভাবে উপকৃত হবেন। সূত্র অনুযায়ী, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে কর্মচারীদের ‘বেসিক পে’ বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিএ (Dearness Allowance) হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে গড় বেতন বৃদ্ধি হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্ব ব্যয়ে বড়সড় প্রভাব ফেলবে। ২০১৬ সালে সপ্তম বেতন কমিশনের পর সরকারি খরচ বেড়েছিল প্রায় ১.০২ লক্ষ কোটি টাকা। এবার সেই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশের মত, সরকারি কর্মীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ পৌঁছালে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। অষ্টম বেতন কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ হবে—নতুন ‘পে ম্যাট্রিক্স’ তৈরি করা। এটি এমন একটি কাঠামো, যা মূল বেতন ও পদোন্নতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পাশাপাশি, বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা পে-ব্যান্ড বা গ্রেড পে নির্ধারণের কাজও কমিশনের আওতায় থাকবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সপ্তম বেতন কমিশনের সময় বেশ কিছু ক্ষেত্রেই ভাতা ও পেনশন কাঠামোতে সংশোধনের দাবি উঠেছিল। এবারও সেই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা কর্মী, রেলওয়ে এবং ডাক বিভাগের কর্মচারীদের জন্য আলাদা কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি হতে পারে। অর্থ মন্ত্রকের একটি সূত্র জানিয়েছে, “সরকার চায় কর্মীদের জন্য এমন একটি বেতন কাঠামো তৈরি করতে যা কর্মদক্ষতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হয়। এবার ফোকাস থাকবে ‘পারফরম্যান্স লিংকড ইনক্রিমেন্ট’-এর উপর, যাতে মেধাবী ও পরিশ্রমী কর্মীরা আরও বেশি প্রণোদনা পান।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সময়সীমা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সংগঠনগুলি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট কাউন্সিল অফ অ্যাকশন’ (NJCA)-এর এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। অবশেষে সরকার আমাদের কথা শুনেছে। আশা করছি, কমিশন কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক চাপের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুপারিশ করবে।” প্রসঙ্গত, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে শুরু হয়েছে উৎসাহ ও প্রত্যাশা। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা যেমন আশাবাদী, তেমনি অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও নজর রাখছেন এই পরিবর্তনের প্রভাবের দিকে। আগামী দেড় বছরেই স্পষ্ট হবে, কীভাবে বদলে যাবে ভারতের সরকারি কর্মী বেতন ব্যবস্থা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)




